1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
কেন বাকশাল প্রয়োজন হয়েছিল? - ebarta24.com
  1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
কেন বাকশাল প্রয়োজন হয়েছিল? - ebarta24.com
বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:১১ পূর্বাহ্ন

কেন বাকশাল প্রয়োজন হয়েছিল?

মাহফুজা হিলালী
  • সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয়েছিল জাতীয়ভিত্তিক রাজনৈতিক দল- বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল। বাকশালের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)। গঠন করেছিলেনও তিনি। এই দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সব দল, মত, শ্রেণি, পেশার মানুষ। সব মানুষকে নিয়ে একটি জাতীয় দল গঠন করে বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক তথা দীন-দুঃখী মেহনতি শোষিত মানুষের সার্বিক মুক্তি চেয়েছিলেন তিনি। একে তিনি ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বা ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বাকশালের উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদী শোষকদের প্রতারণামূলক গণতান্ত্রিক শাসন এবং শোষনের অবসান ঘটিয়ে শোষনহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কেন প্রয়োজন হয়েছিল বাকশাল তথা একটি জাতীয় দলের, তা গবেষণার দাবি রাখে। আরও গবেষণার দাবি রাখে এর মাধ্যমে সত্যিই শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতো কিনা। এর উত্তর পাওয়ার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতির কথা ভুলে গেলে চলবে না। এ ছাড়াও জানতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী মানুষ কারা ছিল এবং স্বাধীনতার পরে এদের ভূমিকা কী ছিল, কী কার্যক্রম চালাচ্ছিল এরা। স্বাধীনতাবিরোধী রাষ্ট্র কোনগুলো ছিল, স্বাধীনতার পরে তাদের ভূমিকা কী ছিল। দেশে কারা জনগণের কথা ভাবতো এবং কারা নিজের স্বার্থ হাসিলের চিন্তা করতো। বাংলাদেশের প্রথম সরকার কী কী বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। তাদের কী কী কাজ করার ছিল, সরকার কতটুকু করতে পেরেছিল। সরকারের কী কী কর্মসূচি ছিল ইত্যাদি। এখানে আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধুর মানস গঠন কীভাবে হয়েছিল, তাঁর অভিজ্ঞতা কতটা বাস্তবসঙ্গত, তাঁর দর্শন কতটা যুক্তিযুক্ত, তাঁর সিদ্ধান্ত কতটা মঙ্গলজনক ছিল ইত্যাদি।

একজন বঙ্গবন্ধু একদিনে তৈরি হননি। শুরুটা হয়েছিল সেই কিশোর বয়সে। টুঙ্গিপাড়ায় এসে যখন স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন থেকে। তখন তাঁর বয়স সতেরো বছর। অবশ্য তারও আগে ১৯৩৬ সালে তাঁর চোখ অপারেশনের পর লেখাপড়া বন্ধ ছিল কিছুদিন। সে সময় তিনি স্বদেশীদের সভায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এ জন্য গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরে যাওয়া-আসা করতেন। সে সময়ই তিনি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ভক্ত হন এবং চিন্তা করেন দেশে স্বাধীনতা আনতে হবে। এরপর ১৯৩৭ সালে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি গোপালগঞ্জে ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করেছিলেন। বাড়ি বাড়ি থেকে মুষ্ঠি ভিক্ষার চাল উঠিয়ে  সেই চাল বিক্রি করে গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার খরচ ও অন্যান্য খরচ দেয়া ছিল এই সমিতির কাজ। এর অনেক কাজ কিশোর বঙ্গবন্ধু করতেন। এরপর যক্ষ্মা রোগে শিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ মারা গেলে বঙ্গবন্ধুই এই সমিতির সম্পাদক হন। এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর।

তারপর ১৯৩৮ সাল থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৩৯ সালেই মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন। এবং তখন থেকে দেশ এবং দেশের সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছু ভাবেননি। তাঁদের বাড়িতে পত্রিকা রাখা হতো, তিনি নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন। শেরে বাংলা এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যও পেয়েছিলেন সেই ১৯৩৮ সাল থেকেই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর সভা-সমাবেশ-বক্তৃতা করে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করেছিলেন।

এরপর আবার আন্দোলন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন দেখলেন, বাঙালিদের অধিকার হরণ হচ্ছে, তখন শুরু করেছিলেন আবার সংগ্রাম-আন্দোলন। এভাবে ৩৮ বছরের (১৯৩৭-১৯৭৫) দীর্ঘ সংগ্রামের জীবনাভিজ্ঞতা তাঁর নিজস্ত দর্শনে স্থিত হতে সাহায্য করেছিল। তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন যে, জনগণই হবে প্রজাতন্ত্রের মালিক। তাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের মূল হলো বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের প্রতি ভালোবাসা। এছাড়া বিশ্ব রাজনীতিও তাঁর দর্শনের সহায়ক হয়েছিল। যেমন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সোভিয়েত রাশিয়ার আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পুঁজিবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের স্নায়ুযুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক চীনা বিপ্লব, চীনের অগ্রযাত্রা, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, কিউবার বিপ্লব, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইত্যাদি। বিশ্ব পরিস্থিতি এবং দেশের অবস্থা- এই দুই অভিজ্ঞতায়ই তিনি বাংলাদেশের মানুষদের উন্নয়নের জন্য নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মার্কিন দূতাবাসের দায়িত্ব নেয় ইউজিন বোস্টার।  দায়িত্ব নিয়ে পরদিনই খন্দকার মোশতাকের সাথে দেখা করে। এদের যৌথ কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন থেকে। অন্যদিকে চীনাপন্থি বাম সংগঠন এবং নকশালরাও শুরু করে খুন ধর্ষণ এবং লুটপাট। এরা সাধারণ মানুষদের হয়রানি করা শুরু করেছিল। আবার ছাত্রলীগও দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। শফিউল আলম প্রধান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে আওয়ামী লীগ-এর বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিল।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশে বঙ্গবন্ধুকে একটি বছর সময় দেয়নি বিরোধীরা, এমনকি যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন তাঁরাও। তাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন স্বাধীনতার সাথে সাথে বাংলাদেশ স্বর্গভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। তাঁদের একবারও মনে হয়নি দেশটা পুরোপুরিভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত। কোনো কিছুই দেশে অবশিষ্ট নেই। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। বিজ্ঞ এবং প্রাজ্ঞরা নিজেদের বিরোধী মনোভাব নিয়ে নতুন দেশে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁদের জ্ঞান দেশ গঠনের কাজে লাগালে দেশের উপকার হতো। কিন্তু তাঁরা শুরু করেছিলেন মুজিববিরোধী কাজ। সমস্ত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা মুজিব বিরোধীতায় কাজে লাগাচ্ছিলেন। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাংলাদেশ।

১৯৭২ সালের অক্টোবরে ভারত থেকে দেশে ফিরে মওলানা ভাসানী শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধীতা, ১৯৭২ সালে ১৭ সেপ্টম্বর আ.স.ম. আব্দুর রব সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ভাষণ দেন। সিরাজ শিকদার নিজের সর্বহারা পার্টি নিয়ে অস্ত্র হাতে নেমে পড়েছিলেন। কর্নেল তাহের বঙ্গবন্ধুর কাজের সবটুকু না বুঝেই সমালোচনা এবং বিরোধীতা শুরু করেছিলেন। এভাবে “১৯৭২ সালের শেষ প্রান্তে ঢাকা শহর ছেয়ে গেল বঙ্গবন্ধু-সরকারবিরোধী পোস্টারে।”

সব মিলিয়ে ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধুর জন্য বৈরি পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এগুলো ছিল প্রকাশ্যে বিরোধীতা। কিন্তু অন্য দিকে আরেকটি দল ভালো মানুষির মুখোশ পরে দেশের মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ রাখছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিবেশ সৃষ্টি করবার। পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন এদের ইন্ধন যোগাচ্ছিল। এই দল ছিল আগের দলের চেয়েও ভয়াবহ। এই শত্রুরা মিত্র সেজে ঘুরছিল বঙ্গবন্ধুর চারপাশে।

বাঙালি যে শত্রু হতে পারে বঙ্গবন্ধু ধারণাই করতে পারেননি। তিনি মনে করেছিলেন, এ সব বিরোধিতা সাময়িক ব্যাপার। তিনি এও চিন্তা করেছিলেন যে এ অবস্থা তিনি রুখবেন। কারণ সাধারণ জনগণ তাঁর পক্ষে ছিল। কিছু বিপথগামী মানুষ হইচই করে তাঁর গতি রোধ করতে পারবে না। তাই এই বৈরি পরিবেশেই বাংলাদেশের সংবিধান প্রনয়ণ হয়েছিল। সংবিধানের মূলনীতি ছিল- বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। মওলানা ভাসানী এই সংবিধানেরও বিরোধীতা করেছিলেন।

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে জাসদ দেশ অস্থির করে তুলেছিল। তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাড়ির সামনে বোমা ফাটিয়েছিল এবং বাড়ির গেটে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। ৫ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের কোন্দলেই ৭ জন ছাত্রলীগ কর্মী প্রাণ হারান। এ কারণে শফিউল আলম প্রধান পল্টন ময়দানে সরকারের মন্ত্রী ও দলের নেতাদের বিরুদ্ধে জনসভা করেন। ১৪ এপ্রিল ভাসানীর ন্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ, বাংলাদেশ গণমুক্তি ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি ( লেলিনবাদী), শ্রমিক-কৃষক সাম্যবাদী দল মুজিব সরকার উৎখাতের ঘোষণা দেয়।

প্রচলিত গণতন্ত্রের নামে বঙ্গবন্ধু এগুলো সহ্য করে যাচ্ছিলেন এবং এ থেকে দেশকে বাঁচানোর উপায় খুঁজছিলেন। উপায় খুঁজছিলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্থান-পতন এবং নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞার আলোকে। তাঁর একমাত্র চিন্তাই ছিল দীনহীন মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু স্বাধীন দেশের পরিবেশ এতাটাই শত্রুভাবাপন্ন হয়ে গিয়েছিল যে তিনি কঠোর হাতে তা দমনের চিন্তা করছিলেন।

এ সময় প্রকৃতিও বৈরি হয়েছিল। বন্যায় সারা দেশ তলিয়ে গিয়েছিল, ধ্বংস হয়েছিল মানুষের বসতবাড়ি, প্রাণ হারিয়েছিল অসংখ্য মানুষ। মারা গিয়েছিল লক্ষ লক্ষ গবাদিপশু, ধ্বংস হয়েছিলো জমির ফসল। সড়ক এবং ট্রেন যোগাযোগ হয়েছিল বিচ্ছিন্ন। এই অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সাহায্য চেয়েও পাননি। মজুদদাররা প্রয়োজনীয় খাদ্য বাজারে ছাড়ল না। এই সুযোগে মোশতাকসহ সমস্ত বিরোধীপক্ষ বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধীতা শুরু করেছিল এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার কাজ শুরু করেছিল গোপনে।

এই অবস্থা সামাল দিতে তিনি বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। যেন অবাধ্য সন্তানকে কঠোর হাতে দমন করে ভালো পথে আনার কৌশল। তিনি বাকশালের মাধ্যমে সরাসরি জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হতে চেয়েছিলেন। বাকশাল গঠন উপলক্ষ্যে তিনি জাতীয় সংসদে যে ভাষণ দেন, তাতে তাঁর লক্ষ্য সম্পূর্ণ বোঝা যায়। জাতীয় সংসদে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন:

‘একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা পেলাম এবং রক্তের বিনিময়ে পেলাম সাড়ে সাত কোটি লোক, ৫৪ হাজার স্কোয়ার মাইল। সম্পদ বলতে কোনো পদার্থ আমাদের ছিল না। সমস্ত কিছু ধ্বংস। … অর্থনৈতিক কাঠামো নেই। একটা ফরেন অফিস নেই, একটা প্ল্যানিং অফিস নেই। নেই একটা কোনো কিছু। এই সুযোগে, যারা আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, নিজেদের একটা বেস করা যায় কিনা, ভবিষ্যতে তাদের স্টুজরা এদেশে সরকার চালাতে পারে কিনা, তার ফিকির খুঁজতে লাগল। কাজ করব না, ফাঁকি দেব। অফিসে যাব না ফাঁকি দেব, ফ্রিস্টাইল। দেশের শত্রুরা এনজয়েইং ফুল লিবার্টি বিদেশিরা আসেন এখানে, তাদের গোপনে দু’বোতল মদ খাইয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্রিফ করে দেয়। আমরা কিন্তু চেষ্টা করলাম। ঠিক আছে, আচ্ছা বল, আচ্ছা কর। আচ্ছা দল গড়, আচ্ছা লেখ, আচ্ছা বক্তৃতা কর, বাধা নেই। ফ্রি-হ্যান্ড। কিন্তু দেখতে পেলাম কী? আমরা যখন এই পন্থায় (প্রচলিত গণতান্ত্রিক পন্থায়) এগোতে শুরু করলাম, বিদেশি চক্র এদেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তারা এ দেশের স্বাধীনতা বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করল এবং ফ্রিস্টাইল শুরু হয়ে গেল। হুড়হুড় করে বাংলাদেশে অর্থ আসতে আরম্ভ করল। দেশের মধ্যে শুরু হল ধ্বংস, একটা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ। মোট কয়েক হাজার কর্মীকে হত্যা করা হল। যারা নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধ করেছে, মুক্তিবাহিনীর ছেলে, তাদেরকে হত্যা করা হল। … (গণতন্ত্রের সুযোগে) এই রাজনীতির নামে হাইজ্যাক, এই রাজনীতির নামে ডাকাতি, টেলিফোন করে মানুষের কাছ থেকে পয়সা আদায় করে বা মানুষের বাড়িতে গিয়ে গহনা কেড়ে নেয়। এ রাজনীতির নামে একটা ফ্রিস্টাইল শুরু হয়ে গেল। তাই এ রাজনীতি আমি চাই না, এ গণতন্ত্র আমার মানুষ চায় না। … এমেন্ডমেন্ড কনস্টিটিউশনে যে নতুন সিস্টেমে আমরা যাচ্ছি তা-ও গণতন্ত্র, শোষিতের গণতন্ত্র। এখানে জনগণের ভোটাধিকার থাকবে। … বহুদিন কারাগারে একলা একলা চিন্তা করেছি, আমার দেশের শতকরা ২০ জন লোক শিক্ষিত, তার মধ্যে এক গ্রুপ পলিটিশিয়ান হয়ে গেলাম। এক গ্রুপ আমরা বুদ্ধিজীবী। এক গ্রুপ টিচার। এক গ্রুপ সরকারি কর্মচারী ও ব্যবসায়ী হয়ে গেলাম। কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেলাম। কেউ অমুক হয়ে গেলাম। আমার সমাজে যত জ্ঞানী-গুণী লোক আছে এবং অন্য ধরনের, তাদের নিয়ে জাতীয় পুল করা দরকার। এই পুল আমি করতে পারি যদি আমি একটা নতুন সিস্টেম চালু করতে পারি এবং নতুন দল, সৃষ্টি করি জাতীয় দল, যার মধ্যে একমাত্র একপথ একভাবে হয়ে দেশকে ভালোবাসা যায়। যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে তারা এসে একতাবদ্ধ হয়ে দেশের মঙ্গলের জন্যে কাজ করে যেতে পারে, এ জন্যই বাকশাল করা হয়েছে।’

এখানে স্পষ্টভাবে বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য বোঝা যায়। বাকশাল গঠন করে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় কাঠামো একেবারে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনায় গ্রামকেই প্রশাসনিক ও উৎপাদন ইউনিট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থা চালু হলে সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতো। আমলাভিত্তিক প্রশাসনের অবসান চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। আবীর আহাদ নিজের মতামতসহ বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়েছেন এভাবে:

‘বঙ্গবন্ধু তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, জনগণের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার স্বাভাবিক কারণে আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের ফন্দিফিকির সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে, দুখী মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে নতুন করে প্রশাসনিক কাঠামো বিন্যাসে উদ্যোগী হলেন। বললেন : ‘… সেকশন অফিসার, তারপর ডেপুটি সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি, এডিশনাল সেক্রেটারি, সেক্রেটারি, মন্ত্রী হয়ে তারপর আসে আমার কাছে। এ সবের কোনও প্রয়োজন নেই। সোজাসুজি কাম চালান।’ … ‘ইডেন বিল্ডিং (সেক্রেটারিয়েট) বা গণভবনের মধ্যে আমি শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা রাখতে চাই না। আমি আস্তে আস্তে গ্রামে, থানায়, জেলা পর্যায়ে এটা পৌঁছে দিতে চাই, যাতে জনগণ সরাসরি তাদের সুযোগ-সুবিধা পায়।’

মূলত রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে সরাসরি সুবিধা দেয়াই ছিলো বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। শিক্ষা ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দকে ‘বিনিয়োগ’ নামে অভিহিত করেছিলেন। সমবায় গঠন করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। চারটি মূলনীতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু দেশের দীন দুখী শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবী মেহনতি মানবগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার এবং তাদের সমষ্টিগত প্রকৃত ‘গণতান্ত্রিক একনায়কতান্ত্রিক’ শাসন প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছেন। আরও উল্লেখ করেছেন- প্রচলিত গণতন্ত্রের বদৌলতে সমাজের মাত্র ৫৫ ভাগ লোকের বা প্রভাবশালী ধণিকশ্রেণির স্বৈরাচারী শাসন ও বল্গাহীন শোষণকার্য পরিচালনার পথই প্রশস্ত হচ্ছে; প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের ভেতরে কোনো বিরোধ নেই; সমাজের বাস্তব অবস্থাই মানুষের চিন্তাধারাকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। সংবিধানের তাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি’ কথাটি রয়েছে। সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ বাদ দিয়ে সমষ্টিগত মানবগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার চিন্তা তিনি করেছিলেন। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে এক পরিবারভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া প্রশাসনকেও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক করার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেনাবাহিনীকে দেশের দৈনন্দিন কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারের শেষ ভাগে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন:

‘আমি জাতির বৃহত্তর কল্যাণে এ পথে নেমেছি। জনগণ সমর্থন দিচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র করে, বাধার সৃষ্টি করে, হুমকি দিয়ে আমাকে নিবৃত করা যাবে না। আমার কাজ আমি করে যাবই। … হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। … আমি যা বলি, তা-ই করে ছাড়ি। যেখানে একবার হাত দেই সেখান থেকে হাত উঠাই না। বলেছিলাম, এদেরকে মুক্ত করে ছাড়ব, মুক্ত করেছি। বলেছি, শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ব, তা-ই করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ্‌। কোনো কিন্তু-টিন্তু নেই, কোনো আপোস নেই।’

এই সাক্ষাৎকারেই তিনি বলেছিলেন তিনি যদি নাও থাকেন তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস বাঙালিরা যে কোনো মূল্যে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য একদিন বাংলার বুকে বাস্তবায়ন করে ছাড়বেন। এতে প্রমাণিত হয় বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণ দ্বিধাহীনভাবে বাঙালির উপর আস্থা এবং বিশ্বাস রেখেছিলেন।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে দেশ গঠনের পরিবর্তে কিছু মানুষ নিজের স্বার্থ হাসিলের চিন্তা করেছিল। তারা এ কারণে তৈরি করেছিল বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। একটি ঘটনা জন্ম দিতো আরেকটি ঘটনার। বঙ্গবন্ধু সব দেখতেন, কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিকভাবে মত প্রকাশ করতে দিতেন। এই অবস্থা বাড়তে বাড়তে দেশ এক অরাজক পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছিল। দেশকে সঠিক পথে আনবার জন্য তাই তিনি রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। কারণ বঙ্গবন্ধুর মনে ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা। জীবনের শুরু থেকে সমস্ত জীবন তিনি দেশের মানুষের মুক্তির চিন্তা করে গেছেন। তাই তিনি সব মানুষের একটি প্লাটফর্ম হিসেবে বাকশাল গঠন করেছিলেন। কিন্তু কাজ শুরু করতে পারেননি। বাকশাল গঠন হওয়ার পর ধনী এবং প্রভাবশালী মহলও শত্রুতা শুরু করে। তারা মনে করে, তাদের হাত থেকে সম্পদ চলে যাবে কৃষক-শ্রমিকের হাতে। আবার প্রশাসনের আমলারাও চিন্তা করে তাদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যাবে জনপ্রতিনিধিদের কাছে; কিংবা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। একইভাবে সামরিক বাহিনীতেও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। তাই সমস্ত সুবিধাবাদী, সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদীদের সম্মিলিত চেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর জীবন প্রদীপ নিভে যায় এবং নিভে যায় বাঙালি জাতির সত্তাপ্রদীপ। তবে বাকশাল-এর উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে আমরা বুঝতে পারি, বাকশালের সমস্ত ধারা বাস্তবায়ন হলে এতো দিনে বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হতো।

তথ্যনির্দেশ
১. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১৩, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, পৃ.৯-১০
২. শেখ সাদী, ১৫ আগস্টের ১০০ মিনিট, ২০১৬, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, পৃ.৬৬
৩. আবীর আহাদ, বঙ্গবন্ধু: বাকশালের রাজনৈতিক দর্শন, ২০১৯, পাললিক সৌরভ, ঢাকা পৃ. ৪৭
৪. প্রাগুক্ত, পৃ.১০৩
৫. শেখ মুজিবুর রহমান, সূত্র : ( বঙ্গবন্ধু, বাকশালের রাজনৈতিক দর্শন, লেখক: আবীর আহাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮

লেখক : মাহফুজা হিলালী , নাট্যকার ও গবেষক।

 





সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ





ebarta24.com © All rights reserved. 2021