বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন

দুঃশাসনের সেই সময়’ এবং…

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৫

ক’দিন আগে হাতে এসেছে ‘দুঃশাসনের সেই সময়’ নামের একটা গ্রন্থ, যার প্রতি পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে বর্বরতা ও নৃশংসতার অসংখ্য রঙিন ছবি। আমি লেখার শুরুতেই বলব, দেশের কেউ যেন রাতে ঘুমাবার আগে গ্রন্থটির পৃষ্ঠা উল্টে ঐ বীভৎস ও পিলে চমকানো ছবিগুলো না দেখেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যে নির্মমতার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছিল দেশজুড়ে তার সাক্ষী হয়ে গ্রন্থটির প্রতি পাতায় রয়েছে হৃদয়-ভাঙা, চক্ষু বিস্ফারিত হবার মতো অজস্র ফটোগ্রাফ। পৃষ্ঠাগুলো রঙিন হওয়ায় কিছু ফটোগ্রাফে নির্যাতিতের সর্বাঙ্গে মাখা রক্তের রঙ এতই লাল যে চোখ ঝলসে যায়, বুক কেঁপে ওঠে। তাই বলছিলাম, এই গ্রন্থের পাতা ওল্টালে হয়ত রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে আতঙ্কে।




কয়েকটি ছবির কথা বলি। যেমন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে মুহুর্মুহু গ্রেনেড হামলার পর রাজপথে পড়ে থাকা নিহত এবং আহত মানুষদের সর্বাঙ্গে যে রক্ত সেই রক্তের রঙ অস্বাভাবিক রকমের লাল। রাজপথে রক্তাক্ত পড়ে আছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতির স্ত্রী নেত্রী আইভী রহমান। অসহায় দুই চোখ তাঁর বিস্ফারিত, ডান হাতে কালো ফ্রেমের চশমা, সারা শরীর গ্রেনেডের আঘাতে রক্তাক্ত। অথবা ড্রেনের উপরই পড়ে রয়েছে সদ্যমৃত সুফিয়া বেগমের নিথর দেহ, যার শাড়িতে তাজা রক্তের ছোপ।

অথবা গ্রেনেডের স্প্রিঙটারে ক্ষতবিক্ষত রফিকুল ইসলাম ওরফে ‘আদা চাচা’। সামনের রিকশার চাকায় অমন লাল রক্তের রঙ কেউ কি কখনও দেখেছে! ২০০১ থেকে পাঁচ বছরের অন্ধকার সময়ে যে অত্যাচার, নির্যাতন চলেছে দেশজুড়ে তা মনে করিয়ে দেবার জন্য উল্লিখিত ‘দুঃশাসনের সেই সময়’ ফটো এ্যালবাম সময়োপযোগী কাজটি করেছে।

২০০১-এর নির্বাচনের আগেই শুরু হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগের মতো অমানবিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্বাচন পরবর্তীকালে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। নির্বিচারে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ব্যাপার যেন সেই দুঃশাসনের সময় নিয়মিত হয়ে উঠেছিল। শিশু এবং বৃদ্ধাকেও ধর্ষণের শিকার হতে হয় সেই সময়। হাজার হাজার সংখ্যালঘু মানুষ বাস্তুভিটা থেকে আশ্রয়হীন অবস্থায় পাড়ি জমায় পার্শ্ববর্তী গ্রামে, শহরের মহল্লায়। তারপরও জীবন রক্ষা হয়নি। অনেকে পাঁচ বছর ধরে বাস্তুভিটায় ফিরেও আসতে পারেনি। মানবতার এত বড় অসম্মান এদেশে স্বাধীনতার পর কখনও হয়েছে বলে জানা নেই। ২১ আগস্টের ভয়াবহ ঘটনায় শহীদ হয়েছিলেন ২২ নেতা ও কর্মী। আহত হয়ে আজও যন্ত্রণায় কষ্টে আছে অনেকেই। দুঃশাসনের সেই সময় সন্ত্রাসী হামলায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া এমপি, আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপিসহ অনেককে।



কেবল দেশীয় প্রতিপক্ষই নয়, নির্যাতনকারীদের তালিকায় বিদেশী দূতাবাস প্রধানরাও ছিলেন। উল্লেখ্য, তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর সিলেটে যে গ্রেনেড হামলা করা হলো তা সর্ব-বিচারেই ভয়াবহ।শুনে থাকি স্মৃতি সতত সুখের। ‘দুঃশাসনের সেই সময়’ ফটো এ্যালবামটির পাতায় পাতায় ছাপা স্মৃতি জাগানো ছবিগুলো দেখলে দুঃখে বুক ভেঙে যায়। স্মৃতি জাগানিয়া ভয়াবহ ঘটনার ছবিগুলো দেখলে দেশের সচেতন সংগ্রামী তরুণের রক্তে উচ্চারিত হবেই প্রতিশোধের দৃপ্ত বাক্য। কবি সুকান্তের ভাষায় বলা যেতে পারে ‘স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবোই।’

২০০৮-এর নির্বাচনে দেশের মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তির পথ খুঁজেছিল। দুঃশাসনের নির্মমতার হাত থেকে তারা বাঁচতে চেয়েছিল। খুনের বদলে খুন নয়, খুনের বদলে ব্যালট দিয়ে তারা পথের ভিখারি করেছিল দুঃশাসনের বর্বর হোতাদের। খালেদা-নিজামী জোট হয়েছিল পথের ভিখারি, তবে অত্যন্ত চতুর পরিকল্পনা এবং অগণতান্ত্রিক ছক কাটা দুষ্কর্মের মাধ্যমে তারা মানুষের মন থেকে মুছে দিতে চেয়েছে দুঃসময়ের ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনার স্মৃতি। ভাবখানা এমন যে, সামনের পাথর চাপায় মানুষ বুঝি সবই ভুলে যাবে। ২০০১-০৬-এর বর্বর, অমানবিক নির্যাতনের কথা কি মানুষ সহজেই ভুলে যেতে পারে?

সাময়িক বিস্মৃতির পাতা উল্টে দিলে সামান্য একটু হৃদয় খুঁড়লেই তো জেগে উঠবে সীমাহীন বেদনা, আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতার ভয়। ‘দুঃশাসনের সেই সময়’ গ্রন্থটি সময়োপযোগী সেই কাজটিই করেছে। গ্রন্থটির পাতা ওল্টালেই মনে পড়বে পৈশাচিকতার নানা স্মৃতি।



এক. ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। বাংলা একাডেমীর জমজমাট বইমেলা থেকে সন্ধ্যা উত্তীর্ণকালে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক ড. হুমায়ুন আজাদ। অতর্কিতে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে তৎকালীন সরকারের মদদপুষ্ট জেএমবি ক্যাডার আতাউর রহমান সানীর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। হুমায়ুনের ওপর আক্রোশের কারণ মৌলবাদ বিরোধী বই লেখা এবং তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং আক্রমণের পেছনে মূল নেতৃত্বদানকারী কুখ্যাত দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী। দুঃশাসনের সেই সময় গ্রন্থের ছবিটিতে হুমায়ুন আজাদের সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত এই ছবিটি মনে করিয়ে দেয় সেই সময়ে বিবেকবান, নৈতিক মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কথা। মনে করিয়ে দেয় সত্য বলার অপরাধে কী ভয়াবহ নৃশংসতার শিকার হতে হয় একজন গুণী শিক্ষককে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট জেএমবি এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের নেতা ও ক্যাডারের নিষ্ঠুরতা ইতিহাসের সকল জালিমকেও হার মানায়।



দুই. মনে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মুহুরীর কথা। ২০০১ সালের ১৬ নবেম্বর সরকার-দলীয় সন্ত্রাসীরা তাঁকে নিজ বাড়িতে মাথায় গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। হত্যার পর দেশে ও বিদেশের ক’টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল অধ্যক্ষ মুহুরীর নিষ্প্রাণ-হৃদয় ব্যথিত করা এক অটোগ্রাফ। সাদা জামায় রক্তের বন্যা, মাথার খুলি থেঁতলে গেছে সন্ত্রাসীর গুলিতে এবং সেখান থেকে ঝরছে.. না, সে বীভৎস দৃশ্যের বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়। দুঃশাসনের কালে একজন নিরীহ শিক্ষাবিদেরও জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। নিরাপত্তা ছিল না নমস্য বিচারপতি কিংবা শুভবাদী সাংবাদিকদের।



তিন. ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনায় হত্যা করা হয় সদালাপী, সৎপ্রাণ, জনপ্রিয় সাংবাদিক মানিক সাহাকে। মানিক সাহা ছিলেন দৈনিক সংবাদ এবং ডেইলি নিউজের খুলনা প্রতিনিধি। বিবিসি’র খুলনা প্রতিনিধিও ছিলেন মানিক সাহা। প্রেসক্লাব থেকে বাড়ি ফেরার পথে মাথায় বোমা মেরে নৃশংসভাবে তাঁকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গ্রন্থের ছবিতে খুলনার রাস্তায় নিথর পড়ে আছে মস্তকবিহীন মানিক সাহার শরীর। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্তের স্রোত। মানিক সাহাকে যাঁরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে চিনতেন তাঁদের কল্পনাতেও আসেনি কিভাবে অমন সজ্জন, নির্লোভ, ‌পেশাঅন্তপ্রাণ একজন সমাজদরদী ও দেশপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে ঐভাবে নৃশংসতার বলি হতে হলো। মানিকের অপরাধ, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী থেকে দেশ ও মানুষের ভালর জন্য কাজ করতেন। তার মানে তৎকালীন দেশ শাসকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, যা বোধহয় এখনও চায়। নইলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে একের পর এক বক্তৃতা-বিবৃতি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চালায় কি করে। পিলখানার নাশকতা অথবা সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টাও তো মনে করা হচ্ছে তাদের ষড়যন্ত্রের কারসাজি।



চার. ২০০১-০৬ সালের শাসনামলে আরেক বরেণ্য শিক্ষককে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করার কথাও মনে পড়ছে। সেই শিক্ষকের নাম প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় নিজ বাড়ির বাইরে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে চারদলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত-শিবিরের নেতৃস্থানীয় গুণ্ডারা। প্রফেসর ইউনুস ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি। অধ্যাপনার বাইরে তিনি বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। এটাই ছিল তৎকালীন শাসকদের কাছে অপছন্দের কারণ।পাঁচ. দুঃশাসনের সেই সময়ে অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় রাজনীতিবিদরাও ছিলেন ঘাতকের টার্গেট।

২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট খুলনায় হত্যা করা হয় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামকে। দিনেদুপুরে আদালতে পেশাগত কাজে যাওয়ার পথে ঘাতকের বোমা এবং পিস্তলের গুলিতে এডভোকেট ইমামকে হত্যা করা হয়। তাঁর সঙ্গে নিহত হন এক নিরপরাধ রিকশাচালকও।

২০০৩ সালের ৭ জুন বিএনপি সন্ত্রাসীদের চাইনিজ কুড়ালের উপর্যুপরি আঘাতে নিহত হন নাটোরের জনপ্রিয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য মনতাজউদ্দিন আহমেদ। একই বছর ১ ডিসেম্বর লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, টানা পাঁচ বছরের নির্বাচিত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সামসুল ইসলামকে সন্ত্রাসীরা জবাই করে হত্যা করে । এ রকম অসংখ্য নৃশংসতার রক্তমাখা স্মৃতি যখনই মনে পড়ে তখনই শিউরে উঠতে হয়। শিউরে উঠতে হয় এই ভেবে যে, যাদের হাতে রয়েছে রক্তের দাগ, যাদের ভাবনায় রয়েছে বর্বর অত্যাচারে দেশ শাসনের খায়েশ; তারা কিভাবে মানুষের সমর্থন পাবে! জাগতিক জগতের যাপিত জীবনে সাধারণ মানুষ হয়ত সাময়িক স্মৃতি বিস্মৃত হয় কিন্তু দুঃশাসনের সেই সময়ের মতো যদি গণমাধ্যম এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মসূচীর মাধ্যমে ভয়াবহ স্মৃতি চোখের সামনে তুলে ধরা যায় তবে মানুষ আর নিষ্ঠুরতার হাতে নিজেকে সঁপে দেবে না।





পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
লেখক : কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


আরও সংবাদ