বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন

যেভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭

রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগ আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয় থেকে। এনবিআর আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক এ তিন খাত থেকে এসব রাজস্ব আদায় করে থাকে। তবে এখন পর্যন্ত রাজস্বের এ তিন খাতের মধ্যে আয়করই মুখ্য ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণীর কর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরও গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়কর রিটার্ন ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। কোন ব্যক্তি করদাতার আয় যদি বছরে আড়াই লাখ টাকার বেশি আয় থাকে তবে তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এরপরে রিটার্ন দাখিল করতে হলে জরিমানা গুনতে হবে। করযোগ্য আয় আছে, কিন্তু রিটার্ন না দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যক্তি করদাতাকে নির্ধারিত কর দিবসের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে। তাই এনবিআর থেকে বারবার এ বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে নিয়ম নীতি প্রচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও করদাতাদের ওয়ানস্টপ সার্ভিস দিতে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী ১ থেকে ৭ নভেম্বর রাজধানীর আগারগাঁয়ের এনবিআর ভবনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আগামী ৮ নভেম্বর দেশের সেরা করদাতাদের সম্মাননা দেয়া হবে যাতে নতুন করদাতা তৈরি হয়। এছাড়া ২০১৭-১৮ কর বছরের জন্য ৩০ নভেম্বর হচ্ছে আয়কর দিবস। এদিনই রিটার্ন দাখিলের সর্বশেষ তারিখ। একজন ব্যক্তি করদাতা ১ জুলাই, ২০১৬ থেকে ৩০ জুন, ২০১৭ পর্যন্ত যে পরিমাণ আয় ও সম্পদ অর্জন করেছেন তার ভিত্তিতে হিসাব করে ২০১৭-১৮ করবর্ষের রিটার্ন বা আয়কর বিবরনী দাখিল এবং নির্ধারিত কর জমা দেবেন।

কারা কর দিবেন : বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা অতিক্রম করলে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। মহিলা ও ৬৫ বছর বয়সোর্ধ্ব নাগরিকের ক্ষেত্রে ৩ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ৪ লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আয় ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে রিটার্ন দিতে হবে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। আর সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় চাকরিদাতদের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা বা তার বেশি হলে রিটার্ন জমা দিতে হবে। এছাড়া কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা চাকরিজীবী, ফার্মের অংশীদার, ব্যবসা বা পেশার নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মী হলে রিটার্ন জমা দিতে হবে। মোটরগাড়ির মালিক (প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাস), ভ্যাট আইনের অধীনে নিবন্ধিত ক্লাবের সদস্য হলে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করলে, চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি বা সার্ভেয়ার বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসেবে কোন স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার নিবন্ধন থাকলে, আয়কর পেশাজীবী হিসেবে এনবিআরে নিবন্ধিত থাকলে, বণিক বা শিল্পবিষয়ক চেম্বার বা ব্যবসায়ী সংঘ বা সংস্থার সদস্যপদ থাকলে, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কোন পদে বা সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হতে চাইলে, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা স্থানীয় সরকারের টেন্ডারে অংশগ্রহণ করলে এবং কোন কোম্পানি বা গ্রুপ অফ কোম্পানিজের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োজিত থাকলে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।

যা যা লাগবে : রিটার্ন দিতে প্রথমে ই-টিআইন লাগবে। এছাড়া করদাতা চাকরিজীবী হলে বেতন বিবরণী, ব্যাংক সুদ থেকে আয় হলে তার বিবরণী বা সার্টিফিকেট, বিনিয়োগ থাকলে তার স্বপক্ষে প্রমাণাদি (সঞ্চয়পত্রের সার্টিফিকেট, জীবন বীমার পলিসি থাকলে প্রিমিয়ামের ফটোকপি, বন্ড বা ডিবেঞ্চারের ফটোকপি) জমা দিতে হবে। গৃহ সম্পত্তিখাতে বা বাড়ি ভাড়া থেকে আয় হলে ভাড়ার চুক্তিনামা বা রসিদের কপি এবং প্রাপ্ত জমাসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, পৌরকর, সিটি করপোরেশন কর দেয়ার রসিদের কপি, ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে বাড়ি কেনা বা নির্মাণ করা হলে ঋণের সুদের সমর্থনে ব্যাংক সার্টিফিকেট, গৃহসম্পত্তির বীমা করা থাকলে বীমার প্রিমিয়ামের রসিদের কপি রিটার্নের সঙ্গে দিতে হবে। অন্য উৎস থেকে আয় থাকলে তার স্বপক্ষে কাগজপত্র জমা দিতে হবে। এছাড়া প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা অথবা ওয়ার্ড কমিশনার অথবা যে কোন টিআইএনধারী করদাতার দ্বারা সত্যায়িত করা ছবি লাগবে।

ই-টিআইএন কি এবং কিভাবে করবেন : রিটার্ন জমা দিতে গেলে প্রথম শর্ত হলো ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার ( টিআইএন) থাকতে হবে। এতে একটি নাম্বার দেয়া থাকে। যা করদাতার নাম্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এনবিআরের ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে এটি যে কেউ করতে পারে। এছাড়া আয়কর মেলায় দিয়ে কিংবা বাড়িতে বসে অন্যের মাধ্যমে টিআইএন করা যায়। এজন্য কাগজপত্র বলতে শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বারটা লাগবে। এছাড়া পেশা ও স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখবেন টিআইএন করতে যে ঠিকানা ব্যবহার করবেন সেটাই হবে আপনার কর অঞ্চল। এছাড়া রাজধানীতে করলে পেশা অনুসারে কর অঞ্চল ভিন্ন হবে।

করের হার : আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হলে কর দিতে হবে না। এরপরের ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের করদাতাদের ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা, অন্য সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে ৪ হাজার টাকা এবং সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্য এলাকার করদাতাদের ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা কর দিতে হবে। ৪ লাখের পরবর্তী ৫ লাখ টাকা আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ এবং পরবর্তী সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। কোন করদাতার প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে তার করমুক্ত আয়সীমার সঙ্গে ২৫ হাজার টাকা যোগ হবে। বিদেশি করদাতাদের আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

কিভাবে দিবেন : করদাতার কর অঞ্চলের নাম টিআইএন এর ওপর লেখাই থাকে। যার যার কর অঞ্চলের অধীনে আয়কর রিটার্ন দিতে হয়। সাধারণ এবং সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম রয়েছে। সাধারণ পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দিলে কর অফিসের দেয়া প্রাপ্তি স্বীকারপত্রটি কর নির্ধারণী আদেশ হিসেবে গণ্য হয় না। রিটার্ন দাখিলের পর উপ-কর কমিশনার কর নির্ধারণ করে থাকেন। পক্ষান্তরে সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে করদাতা নিজেই নিজের আয় নিরূপণ করে কর পরিশোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে করদাতাকে রিটার্ন জমার পর যে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেয়া হয় সেটিই কর নির্ধারণী আদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাই সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেন। তবে করদাতার ১২ ডিজিটের টিআইএন না থাকলে সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করার সুযোগ নেই। তাছাড়া মোট আয়ের ওপর প্রযোজ্য সব আয়কর এবং সারচার্জ পরিশোধ করা না হলে অথবা ৩০ নভেম্বর তারিখের মধ্যে অথবা বর্ধিত সময়ের মধ্যে দাখিল করা না হলে করদাতার রিটার্ন সার্বজনীনের আওতায় পড়বে না।

কর পরিশোধ : ট্রেজারি চালান, পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট ও অ্যাকাউন্ট পে-চেকের মাধ্যমে করদাতা নিজ কর অঞ্চলের অর্থনৈতিক কোডে টাকা জমা দিয়ে কর পরিশোধ করা যায়। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কর ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন করদাতা। তবে এর বেশি আয়কর পরিশোধ করতে চাইলে পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, অ্যাকাউন্ট পে-চেক ব্যবহার করতে হবে।

কর রেয়াত : নির্ধারিতখাতে বিনিয়োগ করলে করদাতারা কর ছাড় পাবেন। এক্ষেত্রে করদাতার মোট আয়ের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগকে অনুমোদনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। উদাহরণস্বরূপ কোন করদাতার আয় যদি ১০ লাখ টাকা হয় তবে তিনি ২৫ শতাংশ বা আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে কর রেয়াত নিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা সাড়ে ৩২ হাজার টাকা কর রেয়াত পাবেন। তবে আয় ১০ লাখ টাকার বেশি, কিন্তু ৩০ লাখ টাকার কম হলে প্রথম আড়াই লাখের জন্য ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট বিনিয়োগের ওপর ১২ শতাংশ হারে রেয়াত পাবেন। আর মোট আয় ৩০ লাখ টাকার বেশি হলে প্রথম আড়াই লাখের জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখের জন্য ১২ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার জন্য ১০ শতাংশ হারে রেয়াত পাবেন।

সারচার্জ বা সম্পদ কর : বিত্তশালী করদাতাদের নির্ধারিত করের অতিরিক্ত সারচার্জ বা সম্পদ কর দিতে হবে। সোয়া ২ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ থাকলে কর দিতে হবে না। তবে সোয়া ২ থেকে ৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে ১০ শতাংশ হারে, ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে ১৫ শতাংশ, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, ১৫ থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত ২৫ শতাংশ এবং ২০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে ৩০ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে। এক্ষেত্রে সম্পদের দলিল মূল্যকে বিবেচনায় নেয়া হবে। করদাতাকে ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা সারচার্জ দিতেই হবে।

সম্পদ বিবরণী ঐচ্ছিক : কোন করদাতার আয় বছর শেষে সম্পদের পরিমাণ ২৫ লাখ টাকার বেশি না হলে, মোটরগাড়ির (প্রাইভেট কার, জিপ বা মাইক্রোবাস) মালিকানা না থাকলে এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট বা গৃহসম্পত্তির মালিক না হলে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে না। তবে উপ-কর কমিশনার চাইলে নোটিশ দিয়ে করদাতার সম্পদের তথ্য চাইতে পারেন।

যেসব বিনিয়োগে রেয়াত : বর্তমানে ২৪টি খাতে বিনিয়োগ বা দান করলে কর ছাড় পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জীবন বীমার প্রিমিয়াম, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা, স্বীকৃতি ভবিষ্যৎ তহবিলে নিয়োগকর্তা বা কর্মকর্তার চাঁদা, সঞ্চয়পত্র ক্রয়, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপোজিট পেনশন স্কিমে বার্ষিক ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে এবং শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত শেয়ার বা মিউচ্যুয়াল ফান্ড ক্রয়, জাকাত তহবিলে দান এবং ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কিনলে কর ছাড় পাওয়া যাবে। এছাড়া শিক্ষা ও সামাজিকখাতে ব্যয়ের ওপর ও ছাড়া পাওয়া যায়।
সূত্র : আয়কর পরিপত্র।


আরও সংবাদ