সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০, ১০:০৯ অপরাহ্ন

অনিয়মের দায় ফারমার্স ও এনআরবিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নিতে হবে!

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৭

ফারমার্স ও এনআরবিসি ব্যাংকের অনিয়মের দায় পরিচালনা পর্ষদকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক।
বেসরকারি খাতের এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়মের ঘটনায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী সংসদীয় কমিটি। ব্যাংক দুটির ঋণ অনিয়মের ঘটনা শিউরে ওঠার মতো এবং আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক। সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ নিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সরকারি হিসাবসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে ডাকা হলেও তিনি উপস্থিত হননি। বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানসহ কমিটির সদস্যরা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ইউনূসুর রহমান এবং ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও তিন ব্যাংকের এমডি উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে ড. আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, সংসদীয় কমিটি চায় না কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাক। প্রয়োজনে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা যেতে পারে। পরিচালনা পর্ষদকেও অনিয়মের দায় নিতে হবে। আমানতকারীর সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কোনো ব্যাংকের অনিয়মের প্রভাব ব্যাংক খাতের পাশাপাশি পুরো অর্থনীতির ওপর পড়ে। এ কারণে ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়ালের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নিয়ে জানাতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের অর্থে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা। তবে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মূলধনের বেশিরভাগ অর্থ এসেছে দুবাই থেকে। দেশ থেকে এসব অর্থ পাচার করে আবার দেশে আনা হয়েছে।

ফারমার্স ব্যাংক : বৈঠকে উপস্থাপিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছর ধরে ফারমার্স ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। পরিস্থিতি এখন এ পর্যায়ে গেছে যে, আমানতকারীর দায় পরিশোধের সক্ষমতা নেই ব্যাংকটির। অর্থ সংকটের কারণে কলমানি ও আন্তঃব্যাংক থেকে ধার করে চলতে হচ্ছে। গত এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টানা নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। নগদ জমা সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে গত বছরের অক্টোবর থেকে ব্যাংকটিকে ১৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনিয়ম ঠেকাতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ব্যাংকটির শাখা সম্প্রসারণ ও ঋণ বিতরণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ব্যর্থতা আরও প্রকট হবে।

এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংকটির গ্রাহক আমানত রয়েছে পাঁচ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। আন্তঃব্যাংক আমানত রয়েছে ৫৩৫ কোটি এবং কলমানি থেকে ধারের পরিমাণ ১৪৫ কোটি টাকা। গত জুনে ব্যাংকটির ৩০৬ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মোট ঋণের ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এ হার নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত না করে উদ্দেশ্যবহির্ভূতভাবে ঋণ, অস্তিত্বহীন ও সাইনবোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ এবং জেনেশুনেও খেলাপি গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। ঋণ বিতরণে নিজস্ব নীতিমালাও মানা হয়নি। একক গ্রাহকের সর্বোচ্চ সীমা অমান্য করে বড় ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ভুল তথ্য প্রদান, অন্য ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অধিগ্রহণ, নির্বাহী কমিটি, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শাখা প্রধান এখতিয়ারবহির্ভূত ঋণ, প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট না নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। লোকবল নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে।

এনআরবি কমার্শিয়াল : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক নিয়মাচার না মেনে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল আহসানের স্বার্থ সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয়। অনুপস্থিত সদস্যকে পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত দেখিয়ে কার্যবিবরণী প্রস্তুত করা হয়। এভাবে নানা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণের অর্থ বের করে দেওয়ার সঙ্গে পর্ষদ সদস্য ও এমডি জড়িত। পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি। এসব ঘটনায় ব্যাংকের এমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে। আর চেয়ারম্যানের দেওয়া জবাবও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনাধীন।

এতে আরও বলা হয়েছে, নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ হুহু করে বেড়ে এখন ১৯২ কোটি টাকা হয়েছে, যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণে নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকের পরই ব্যাংকটির অবস্থান। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১৯ কোটি টাকা। গত জুনে বেড়ে ১৭২ কোটি টাকা হয়। কার্যক্রম শুরুর কিছুদিনের মধ্যে ব্যাংকটির পরিচালকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এসব অনিয়ম ঠেকাতে দুটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক রয়েছে।

এবি ও ইসলামী ব্যাংক :বৈঠকে গত জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এবং এবি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংঘটিত ঋণ অনিয়মের বিষয়ে আলোচনা হয়। এবি ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে জানানো হয়, অফশোর ব্যাংকিং থেকে সিঙ্গাপুরে পাচার ২৯৯ কোটি টাকার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট পরিদর্শন করেছে। ওই পরিদর্শনের আলোকে চারটি দেশের এফআইইউতে তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আর নতুন পর্ষদ গঠনের পর সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের ঋণ বিতরণের হার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধির পাওয়ায় ব্যাংকটি কোন খাতে কী পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, কমিটির আগামী বৈঠকে তা জানাতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন ও বিদেশি শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়। তবে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, এমডিসহ কয়েকজন পরিচালক পদে পরিবর্তনে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


আরও সংবাদ