শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২০, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

সৌদি আরবে ক্ষমতার মেরুকরণ, যুবরাজ মোহাম্মদ মুখ্য ভূমিকায়

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭

সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা যুবরাজ এবং মন্ত্রীদের আটকে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একসঙ্গে এতজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিকে আটকের ঘটনা আধুনিক সৌদি আরবের ইতিহাসে নজিরবিহীন। দেশের অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অনেকটা আকস্মিকভাবেই সৌদির নেতৃত্ব ও রাজপরিবারে ক্ষমতার এই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটল। আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনতেই এ পথ বেছে নিয়েছেন তার বাবা বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। আবার অনেকে মনে করছেন, দুর্নীতি দমনের নামে সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অন্তরালে দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে।

কিন্তু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের আটকের খবরে সৌদি আরবের আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্নেষকরা। গত জুনে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন সালমান। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে একটি দুর্নীতি দমন কমিটি গঠনের পর গতকাল রোববার দেশটির ১৭ রাজপুত্র, চারজন বর্তমান মন্ত্রী ও ১০ জন সাবেক মন্ত্রী এবং অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ক্ষমতাধর ধনকুবের প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল এবং প্রিন্স মেতিব বিন আবদুল আজিজও রয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি ন্যাশনাল গার্ড এবং নৌবাহিনী প্রধানের পদেও করা হয়েছে রদবদল। খবর বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, আল জাজিরা ও এএফপির।

৩২ বছর বয়সী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদকে প্রধান করে শনিবার সৌদি বাদশাহ নিজে একটি দুর্নীতি দমন কমিটি গঠন করেন। সৌদি বাদশাহ সালমান শনিবার এ কমিটি নিয়ে আদেশ জারি করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই শীর্ষ নেতাদের আটকের খবর এলো গণমাধ্যমে। বাদশাহর এ আদেশের মধ্য দিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদের প্রভাব আরও সুসংহত করা হলো বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

সৌদি আরবের প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের ছেলে মেতিবকে একসময় সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার বলে মনে করা হতো। রাজপরিবারে আবদুল্লাহর বংশধরদের মধ্যে কেবল তিনিই সৌদি সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে ছিলেন।

আটক করার কারণ সম্পর্কে এখনও সরকারিভাবে কিছুই প্রকাশ করা হয়নি। তবে সৌদি গণমাধ্যম আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, ২০০৯ সালে সৌদি আরবে যে বন্যা হয়েছিল এবং ২০১২ সালে মার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার যে ঘটনা ঘটেছিল, এ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, যুবরাজকে প্রধান করে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেখানে তাকে যে কাউকে গ্রেফতার করার এবং যে কারও ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, এই কমিটির লক্ষ্য জনগণের জানমালের সুরক্ষা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া।

মূলত বাদশাহ সালমান এক ডিক্রির মাধ্যমে যুবরাজের নেতৃত্বে নতুন দুর্নীতি দমন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর পরই বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রীদের গ্রেফতার শুরু হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে বিলিয়নেয়ার প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল রয়েছেন, যার মালিকানায় রয়েছে ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম কিংডম হোল্ডিং। তার গ্রেফতারের খবরে এ প্রতিষ্ঠানটির ১০ শতাংশ শেয়ার পড়ে যায়। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন এই যুবরাজ। নিউজ করপোরেশন, সিটি গ্রুপ, টুইটার ও অনেক সুখ্যাত কোম্পানিতেও তার শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া আরবজুড়ে স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্কও তার নিয়ন্ত্রণে। আল ওয়ালিদের গ্রেফতারে সৌদিসহ বিশ্বের বড় বড় আর্থিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে বড় রকমের প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইব্রাহিম আল আসাফও গ্রেফতার হয়েছেন।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়, সৌদি ন্যাশনাল গার্ড এবং নৌবাহিনী প্রধানের পদে বড় পরিবর্তন এনেছেন বাদশাহ সালমান। ন্যাশনাল গার্ডবিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে প্রিন্স মেতিব বিন আবদুল আজিজকে সরিয়ে খালেদ বিন আইয়াফকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আদেল আল ফাকিহর বদলে এসেছেন ওই মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-তোইজরি। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সুলতান বিন মোহাম্মদ আল সুলতানকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া আটকদের মধ্যে রয়েছেন রিয়াদের সাবেক গভর্নর প্রিন্স তুর্কি বিন আবদুল্লাহ, রয়্যাল কোর্টের সাবেক প্রধান খালিদ আল তোয়াইজরি, সৌদির বিন লাদেন গ্রুপের প্রধান বকর বিন লাদেন, রয়্যাল কোর্টের সাবেক প্রটোকল প্রধান মোহাম্মদ আল তোবাইশি, সৌদির জেনারেল ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির সাবেক গভর্নর আমর আল-দাব্বাগ, এমবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মালিক আল ওয়ালিদ আল ইব্রাহিম, সৌদি এয়ারলাইন্সের সাবেক মহাপরিচালক খালিদ আল মুলহেইমসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার একটি সূত্র উদ্ৃব্দত করে বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, অভিযানের ভয়ে ব্যক্তিগত বিমান নিয়ে পালানোর সময় জেদ্দায় কয়েকটি জেটের উড্ডয়ন আটকে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। ধারণা করা হচ্ছে, ওই জেটগুলোতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই ধরপাকড়ের প্রতি সৌদি আরবের ধর্মীয় নেতারা সমর্থন জানিয়েছেন। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাদের কাউন্সিল এক টুইট বার্তায় বলেছে, দুর্নীতি দমন অভিযান সৌদি আরবের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

দুই সপ্তাহ আগে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান কয়েক হাজার আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীকে নিয়ে রিয়াদে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, সৌদি আরবের আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে তার পরিকল্পনার মূলমন্ত্র হবে ইসলামের কট্টর অবস্থান থেকে উদার নীতিতে ফিরে আসা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব তেলনির্ভর অর্থনীতির বিকল্প খুঁজতে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।


আরও সংবাদ