সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:০০ অপরাহ্ন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পক্ষপাতিত্ব না করার আশ্বাস চীনের

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয় দেশের প্রতিবেশী হিসেবে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় চীন। গতকাল শনিবার ঢাকায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উইং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে নিরপেক্ষভাবে সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় সহযোগিতা করতে চায় চীন। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। কিন্তু এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়েছে।

ওয়াং উইকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘চীন রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনায় সহযোগিতা করতে আগ্রহী। এ সংকট মোকাবেলা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ’

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁর দেশ চায় না যে ‘বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের’ (বিসিআইএম ইসি) কর্মকাণ্ডে ধীরগতি আসুক।

বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। মিয়ানমার এ সংকটের টেকসই সমাধান করে সম্মান, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমারকে বাংলাদেশ থেকে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দুর্দশার চিত্র বর্ণনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নারীদের বড় অংশই গর্ভবতী।

বাংলাদেশের মাটি প্রতিবেশী কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতায় ব্যবহার হতে না দেওয়ার সরকারি অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের দৃঢ় সিদ্ধান্ত। ’

বাসস জানায়, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১০ ও ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের এবং গত বছর চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের সময় গৃহীত ‘স্ট্র্যাটেজিক অংশীদার সহযোগিতা’র অগ্রগতি দেখতে তিনি বাংলাদেশ সফর করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চীনা প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন।

বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই বলেন, বাংলাদেশকে দেওয়া তাঁর দেশের সহজ শর্তে ঋণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। চীন ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার’ আওতায় বাংলাদেশকে আরো সাহায্য করতে চায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল করিম ও বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংছিয়াং এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গতকাল শনিবার দুপুরে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় যান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, গত অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের সময় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বন্ধু হিসেবে চীন এ সংকট সমাধানে সহযোগিতা করবে এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয়ের বন্ধু হিসেবে চীন রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী রোহিঙ্গাদের সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চীনের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ রবিবার বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার যাবেন : উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের আপত্তির কারণেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো প্রস্তাব আনতে পারছে না। গত বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাবের বিপক্ষে চীন ভোট দিলেও তা ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গৃহীত হয়। চীন চায় না বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাক। কিন্তু বাংলাদেশ মনে করে, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করবে না।

দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান চায় চীন : সফররত চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই গতকাল ঢাকায় চীনা দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিককে বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগে যথার্থ একটি সমাধান খুঁজে পাওয়াকেই চীন সমর্থন করছে। তিনি বলেন, ‘দুই দেশ প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি চুক্তি সই করতে পারে। আমরা এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানাই ও সমর্থন করি। ’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীনের অবস্থান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের উদ্যোগ এমন হতে হবে যা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, পরিস্থিতিকে আরো জটিল ও সমাধানকে আরো কঠিন করে তোলা নিরাপত্তা পরিষদের উচিত হবে না।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ সংকট নিরসনে অগ্রগতির দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিকে চীন স্বাগত জানায়। তবে নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের উচিত আরো অনুকূল পরিবেশ এবং এ সংকট সমাধানে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সহযোগিতা করা। তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাই, এখানে চীনের নিজের কোনো স্বার্থ নেই। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—কারোরই পক্ষ আমরা নেব না। ’

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁর দেশ পরিস্থিতির যথার্থতা যাচাই করবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয়েরই ভালো বন্ধু হিসেবে চীন গঠনমূলক ভূমিকা পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশি বন্ধুরা চীনের অবস্থান বুঝতে পারবে। ’


আরও সংবাদ