শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ
পঁচাত্তরের খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ “ধর্ষিত” মামুনের স্ক্রিনশপ জালিয়াতি ফাঁস : ইলিয়াস সহ সুশীলদের কটাক্ষ জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ : বিশ্ব সভায় বাংলা ভাষার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব গার্ডিয়ানে প্রকাশিত শেখ হাসিনার নিবন্ধ: ‘আ থার্ড অফ মাই কান্ট্রি ওয়াজ জাস্ট আন্ডারওয়াটার। দ্য ওয়ার্ল্ড মাস্ট অ্যাক্ট অন ক্লাইমেট’ হেফাজতের কর্তৃত্ব যাচ্ছে দেওবন্দের কাফের ঘোষিত জামায়াতের কব্জায় ! অনলাইনে মিলছে টিসিবির পেঁয়াজ আজ টিউলিপ সিদ্দিকের জন্মদিন বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ফোন ফ্রন্টিয়ার, ইমার্জিং ও ডেভেলপড মার্কেট রিটার্নে সবার ওপরে বাংলাদেশ

নকল ও ভেজাল ঔষধ বেচে কোটিপতি হওয়া পিনাকী ভট্টাচার্যের অপকর্ম ফাঁস (ভিডিওসহ)

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

।। ডাঃ জাহিদুর রহমান ।।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প জগতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক জালিয়াতের নাম পিনাকী ভট্টাচার্য এবং পপুলার ফার্মাসিটিক্যালস। ২০০৮ সালে পিনাকী ভট্টাচার্য পপুলারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সাথে সিন্ডিকেট করে কয়েক কোটি টাকা লুটপাট করে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে বিষয়টি নিয়ে তখন তেমন কোন আলোচনা হয়নি।

লজ্জার ব্যাপার যেই পিনাকী ভট্টাচার্য কালাজ্বরের ক্যাপসুলে ময়দার দলা পুরে কোটিপতি হয়েছে, তার কাছ থেকেই আজকে আমাদের সবার নৈতিকতার সবক নিতে হয়।

২০০৮ সালের মে মাসে কালাজ্বর নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশে কালাজ্বরে আক্রান্ত রুগিদের মধ্যে বিনামূল্যে পপুলারের তৈরি ক্যাপস্যুল মিল্টেফস (মিল্টেফসিন) বিতরণ শুরু করে। ঋণ হিসেবে টাকাটা দেয়ার কথা ছিল ডব্লিউএইচওর, কিন্তু শর্ত ছিল যেসব ওষুধ কেনা হবে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঐ ওষুধ উৎপাদনের কমপক্ষে ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা লাগবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টেন্ডার দিলে তাতে আবেদন করে দুটো কোম্পানি, একটি জার্মানির ইটার্না জেন্টারিস অপরটি বাংলাদেশের পপুলার। প্রথমটির তৈরি মিল্টেফসিন ছিল মানসম্মত, পরীক্ষিত, উৎপাদনের অভিজ্ঞতাও ছিল ২ বছরের বেশি। তারপরও কোন এক রহস্যময় কারনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পপুলারের তৈরি মিল্টেফসিন কেনে, যাদের এই ওষুধ তৈরির কোন পুর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। পরবর্তিতে পরীক্ষা করে এও দেখা যায় যে, পপুলারের মিল্টেফসের মধ্যে মিল্টেফসিনেরই কোন অস্থিত্ব নাই। এরকম মোটা দাগের দূর্নীতি দেখে ডব্লিউএইচও তাদের ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। শুধুমাত্র পপুলারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আবারও টেন্ডার ডাকে এবং ২ বছরের অভিজ্ঞতার শর্তটি তুলে নেয়।

জানা গেছে একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালানী ও প্রতারক চক্র চীন ও ভারত থেকে এক ধরনের ঔষধ চোরাইপথে আমদানি করে ইচ্ছামতো বিদেশি সিল মেরে বিভিন্ন ফার্মেসিতে সরবরাহ করে আসছে। এই চক্রটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে পপুলার ফার্মাসিটিক্যালসের মাধ্যমে কালাজ্বরের ঔষধের নামে নকল ঔষধ তৈরি করে সরকারের কোটি টাকা লোপাট করে।
২০০৮ সালে সরকার বৈদেশিক অর্থায়নে এ বছরের শুরুর দিকে সারা দেশে কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বিনামূল্যে ঔষধ সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছিল। পপুলারের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি দেখভাল করে প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার, আজকের সুশীল ছাগু সমাজের প্রতিনিধি তথা ঔষধ জালিয়াত চক্রের অন্যতম হোতা পিনাকী ভট্টাচার্য। পপুলারের পক্ষ থেকে এই ঔষধ সরবরাহের কাজ নিয়ে ক্যাপস্যুলে কালাজ্বরের অন্যতম উপাদান মিল্টেফস বা মিল্টেফসিন দেয়ার কথা থাকলেও শুধু ময়দা দিয়ে ঔষধ তৈরি করা হয়।

সরকার ৫ কোটি টাকার কালাজ্বরের ক্যাপসুলের নামে ময়দার দলা কিনে পপুলারের কাছ থেকে এবং দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েকশো রুগিকে পপুলারের তৈরি মিল্টেফসিন ফুল ডোজে খাওয়ানোর পরও তাদের জ্বর কমেনি, পরীক্ষা করে তাদের সবার দেহেই আবার কালাজ্বরের জীবাণু পাওয়া গিয়েছিল। অথচ জার্মানির তৈরি একই ওষুধ খেয়ে আগের সব রুগি সুস্থ হয়ে উঠেছিল।
কালা জ্বরে সারা দেশে ২৮৯ জনের মৃত্যু হলে ভেজাল ঔষধের প্রমাণ পেয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। ভেজাল ও নকল ঔষধ তৈরি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পপুলার ফার্মাসিটিক্যালসের ঔষধ ক্রয় বন্ধ করে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যাক্টরীর কারখানায় অভিযানও চালিয়েছিল র‍্যাব।

জেনেশুনে জীবন রক্ষাকারী কোন ড্রাগ নিয়ে মানুষের সাথে এরকম প্রতারণা করা পিনাকীর মত অমানুষের পক্ষেই সম্ভব। মান কিছু কম হতে পারে, তাই বলে ক্যাপসুলের মধ্যে কোন ড্রাগই থাকবে না? পিনাকী ভট্টাচার্য অবশ্য তখনও তার স্বভাবসুলভ ভন্ডামি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে পপুলারের ওষুধ মানসম্মত। অথচ ডব্লিউএইচও নেদারল্যান্ড থেকে পরীক্ষা করিয়ে প্রমাণ করে পপুলারের তৈরি কালাজ্বরের মিল্টেফস ক্যাপসুল সম্পূর্ণভাবে মিল্টেফসিনবিহীন!

অবস্থা বেগতিক দেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পপুলারের মিল্টফস ক্যাপসুল সরবারহ বন্ধ করে এবং এই ওষুধের সব ধরনের উৎপাদন এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষনা করে।

এদিকে, পপুলার ফার্মাসিটিক্যালসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অবগত নয় এবং ঔষধের জন্য প্রয়োজনীয় মিল্টেফস আমদানি করা হলেও ঔষধ জালিয়াত চক্রের অন্যতম হোতা পপুলারের সিইও পিনাকী ও ফ্যাক্টরি ম্যানেজার শাহজাহানের যোগসাজসে নকল ও ভেজাল ঔষধ তৈরি করা হয়েছে।

আমদের স্মরণশক্তি খুবই দুর্বল, তাই আমরা এই জঘণ্যতম অন্যায়ের বিস্তারিত জানতে চাই। জানতে চাই, পরবর্তিতে পিনাকী ভট্টাচার্যসহ পপুলার ফার্মা এবং এর সাথে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের কী শাস্তি হয়েছিল? আমরা জানতে চাই, পপুলার থেকে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার প্রায় ৪৫ হাজার মিল্টেফস ক্যাপসুলের কি পরিণতি হয়েছিল? কালাজ্বরের রুগিদের যে ওষুধের নামে ময়দার দলা খাওয়ানো হয়েছিল, তার দায়িত্ব কে নিয়েছিলেন? এ বিষয়ে কি বর্তমান সরকারের কিছুই করার নেই? দুদকের ক্ষমতা নেই মাত্র ৯ বছর আগের দুর্নীতির তদন্ত করার? নাকি তখনই মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে পিনাকী গং এত বড় দূর্নীতি করেও আইনের হাত থেকে ফসকে গিয়েছিল?

আর কারো কাছে না হোক, ডব্লিউএইচও ও টেলিগ্রাফ পত্রিকার কাছে অবশ্যই পিনাকী ভট্টাচার্য এবং পপুলারের যাবতীয় অপকর্মের দলিলপত্র আছে। সেগুলো কি আবার সামনে নিয়ে আসার কোন উপায় নেই?

মিল্টেফস নিয়ে “The American Journal of Tropical Medicine and Hygiene” এর জার্নালের লিংক।

পরিচিতি: ভাইরোলজিস্ট, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়


আরও সংবাদ