বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

বিভ্রান্ত বিএনপির স্বাধীনতা নিয়ে উদ্ভট খোয়াব

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বুধবার, ১১ নভেম্বর, ২০২০

অজয় দাশগুপ্ত: ‘৭ নবেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছিল। যে জাতীয়-আন্তর্জাতিক কারণে ৩ নবেম্বরে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়েছিল, সেই চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিয়ে এ দেশের দেশপ্রেমিক সিপাহী এবং জনগণ ৭ নবেম্বরে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে দেশে সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতাকে সুসংহত করেন। একই সঙ্গে গণতন্ত্রের যে পথ, সেই পথের নতুন সূচনা করেন।’ কথাগুলো কে বলতে পারে বলে মনে হয় আপনার? বিএনপি নেতাদের ভেতর সবচেয়ে মিষ্টিভাষী, পরিমিত মির্জা ফখরুল। জ্বি, তিনিই বলেছেন এ কথা। বিএনপি তাদের স্বভাবসুলভ কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের আপত্তি আছে এক জায়গায়। এদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ থেকে ৪৯ বছর আগে। আগামী বছর জাতি সুবর্ণজয়ন্তী পালন করার আশায় বুক বেঁধে আছে। এই স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি। দেশের ইতিহাস বা অতীত নিয়ে যারা এক বিন্দুও জানেন তাদের অজানা নয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল কতটা ত্যাগ আর সংগ্রামের। উপমহাদেশের বড় দুই দেশ- নিকটতম প্রতিবেশী ভারত আর একদা আমরা যাদের অংশ ছিলাম সেই পাকিস্তানের একটিও সেভাবে স্বাধীনতা লাভ করেনি। তাদের স্বাধীনতা এসেছিল চুক্তির মাধ্যমে। আমরা তেমন কোন চুক্তির ভেতর দিয়ে স্বাধীন হইনি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। এক কোটি মানুষ দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি নিজে পরিবারসহ শরণার্থী ছিলাম। আমার ব্যাংকার পিতা, স্নেহময়ী জননী আর দুই দিদির যে কষ্ট আর দুঃখ, তেমন বা তার চেয়ে বেশি ত্যাগ আর কষ্ট করা কোটি কোটি বাঙালী কেন এসব মুখ বুঝে সহ্য করেছিল? ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদসহ নেতারা কেন এত পরিশ্রম করেছিলেন? কেন আমাদের জাতির জনক নয় মাস ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে? সবই কি দেশকে পরাধীন রাখার জন্য? বা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হওয়ার আশায়?

অথচ মির্জা ফখরুল ইসলাম অবলীলায় বলে দিলেন, দ্বিতীয়বার দেশ স্বাধীন হয়েছিল ১৯৭৫-এর ৭ নবেম্বর। ফখরুল সাহেব নিশ্চয়ই জানেন কেন এবং কি ঘটেছিল সেদিন। আমরা যারা তখন যৌবনের দ্বারপ্রান্তে নিজের চোখে দেখেছি কতটা ভ-ামি আর কাপুরুষতায় ডুবে গিয়েছিল দেশ। সে সময়কার দি টাইমস ছিল দুনিয়ার সেরা ম্যাগাজিন। চালু ও জনপ্রিয়। তারা ঠাট্টা করে লিখেছিল, বাংলাদেশ নাকি দ্য ক্যু ক্যু ল্যান্ড! কথাটা ব্যঙ্গ করে বলা হলেও মিথ্যা ছিল না। কে যে কখন গদিতে আর কে যে খলনায়ক বোঝা যেত না। এই ফাঁকে বাংলাদেশ হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা শূন্য। ভাল করে বললে বলতে হবে বীরশূন্য। খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, ব্রিগেডিয়ার জামিলের মতো দেশপ্রেমিক বীরদের সরিয়ে দিয়ে রাস্তা সাফ করেছিল পাকিপ্রেমীরা।

বঙ্গবন্ধুর খুনী আর ঘাতক দালালরা মিলে এই দেশকে আওয়ামী শূন্য ও মুক্তিযুদ্ধ শূন্য করার অপচেষ্টা সার্থক করার দিনটিকে ফখরুল বলছেন দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস। সে সময়কালে জাসদ আর গণবাহিনীর ভূমিকাও ছিল তুমুল প্রশ্নবিদ্ধ। কর্নেল তাহেরকে যারা হিরো করতে চান বা হিরো বানিয়ে উপন্যাস, প্রবন্ধ লেখেন, তারা কৌশলে কথাগুলো এড়িয়ে চলেন। কেউ একবারের জন্যও বুক ঠুকে বলতে পারেন না কর্নেল তাহেরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো মিথ্যা। এ কথা বহুল প্রচলিত যে, কর্নেল তাহের বঙ্গবন্ধুর লাশ বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে বলেছিলেন। সে কথা মিথ্যা এমন কোন প্রমাণ এখনও হাজির করতে পারেনি জাসদ। আর এটা তো সবাই জানেন, সে সময়ে জাসদ ও কর্নেল তাহের না থাকলে জিয়াউর রহমান সামনে আসা তো দূরে থাক জানেও বাঁচতে পারতেন না। তাকে গৃহবন্দী থেকে মুক্ত করা, তাহেরকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছিল কে বা কারা? এই তথ্যগুলো ফখরুল সাহেবের অজানা কিছু নয়। জেনেশুনে তারা এমন মিথ্যাচার করেন বলেই বিএনপির আজ এই করুণ পরিণতি। আজ যে কোণঠাসা ও গৃহবন্দী বিএনপি তার কারণ এই মিথ্যাচার।

মির্জা ফখরুলের জানা আছে এবং এটা মনে রাখা উচিত, হাজার চেষ্টা করেও তারা ইতিহাস পাল্টাতে পারেননি। বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে কি করেনি সে তর্কে না গিয়েও বলি- আপনারা দেশের খোলনলচে বদলানোর পরিকল্পনা করলেও পারেননি। বাংলাস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। উল্টো জনসমর্থন থাকার পরও ছেঁড়া কাগজের মতো গুটিয়ে গেছে আপনাদের দল। আর সে আপনি এই কঠিন সময়ে এমন একটা কথা বললেন যা আপনাদের নেতা জিয়াউর রহমান বা তার সঙ্গীদের কারও মুখ থেকেও বের হয়নি। আমাদের রাজনীতির এই এক রূপ; এ এক অপরাধ। যখন যা মুখে আসে বলেন নেতারা। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা বা দায়িত্ববোধহীন কথাবার্তাই সব রাজনৈতিক দলের জন্য অভিশাপ। সে অভিশাপ আর এক দফায় সত্য প্রমাণ করলেন মির্জা ফখরুল। না আপনারা পারলেন আপনাদের নেতাকে মুক্ত করতে, না একটা মিছিল করে দেখাতে। এমন কথা মানা কঠিন যে, কেবল ভয়ভীতির জন্য আপনারা পারেননি। তেমন হলে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এভাবে রাস্তায় নামতে পারত না। পারত না ছাত্রছাত্রীরা। আপনারা নিজেদের দুর্বলতার কারণে, ভুল রাজনীতির কারণে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারেননি। একাধিকবারের প্রধানমন্ত্রী এখনও বাইরে আছেন সরকারের দায় ও বদান্যতায়।

আপনি আজ এই যে একটা ভুল কথা বললেন এর জন্য একদিন আপনাকে সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেই। এই দেশ আর ইতিহাস এটা মনে করিয়ে দেয় কাউকে ছাড় দেয়নি এই মাটি। এই মাটি রক্তভেজা মাটি। এই মাটির তলায় ঘুমিয়ে আছেন লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা। এই দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার পৃথিবীর বিস্ময়। দুনিয়া এই ইতিহাস আজ অবনত মস্তকে স্বীকার করে। আমেরিকা, চীন এমন কি পাকিস্তানও আমাদের স্বাধীনতা ও অর্জনকে সম্মান করতে বাধ্য হয়েছে। আর আপনি বলছেন, বাংলাদেশ নাকি দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছিল। এর জন্য কি আপনার বিচার চাওয়া অনুচিত?

রক্ত দিয়ে কেনা তিরিশ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত, কয়েক লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বদলে পাওয়া স্বাধীনতার প্রতি আপনাদের চূড়ান্ত অবমাননা সবসময় পীড়াদায়ক। এর আগে গয়েশ্বর বাবু করেছেন। এবার আপনিও। মির্জা ফখরুল কি এর জন্য ক্ষমা চাইবেন জাতির কাছে?


আরও সংবাদ