1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
যাদের নির্দেশে কলঙ্কিত জেল হত্যা - ebarta24.com
  1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
যাদের নির্দেশে কলঙ্কিত জেল হত্যা - ebarta24.com
রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:০২ পূর্বাহ্ন

যাদের নির্দেশে কলঙ্কিত জেল হত্যা

ইবার্তা সম্পাদনা পর্ষদ
  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

৩ নভেম্বরে ঢাকা সেনানিবাসে ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থানে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট হত্যা মিশনে অংশ নেয়া সেনা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরা। তারা ভেবেছিলেন, বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়া খালেদ মোশাররফ ও শাফায়েত জামিলরা হয়তো কেবল সেনাপ্রধান জিয়াকে বন্দি করে বা ক্ষমতাচ্যুত করেই ক্ষান্ত হবেন না, তারা হয়তো জেল ভেঙে জাতীয় নেতাদের বের করে আনবেন এবং রাষ্ট্রপতি মোশতাক ও ফারুক-রশীদদের হত্যা করবেন।

এই আতঙ্ক থেকে মোশতাক-ফারুক-রশীদরা জেল হত্যার ছক কষে বলে মনে করেন ঘটনার প্রতক্ষদর্শী ও গবেষকরা। বিভিন্ন লেখায় ও বর্ণনায় তারা সেই বিষয়গুলো তুলেও ধরেছেন। এই ঘটনা এতো পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল যে, হত্যাকাণ্ডের ৩০ ঘণ্টা পর সেনানিবাস ও জনসাধারণ এ ঘটনা জানতে পারে। ঘটনার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দেশত্যাগের সুযোগ দেয়া হয়, তাদের থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়।

মূলত জাতীয় নেতাদের হত্যার মাধ্যমে মোশতাক তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করেছিলেন এবং ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন।

৩ নভেম্বরের সেনা অভ্যুত্থানের অন্যতম সাক্ষী লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসি তার তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা বইয়ে বর্ণনা করেছেন জেলহত্যার ঘটনাবলি। বইয়ের ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন: ‘ঘটনার পরের দিন ৪ নভেম্বর দুপুরের দিকে পুলিশের আইজি বঙ্গভবনে ফোন করলে জেনারেল খলিল ফোন ধরেন। আইজি তাকে জানান, গত রাতে আর্মির লোকজন জেলে ঢুকে চার আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যা করেছে। তিনি চমকে ওঠেন! সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটে গিয়ে প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারি মাহবুব আলম চাষীকে সংবাদটি দিয়ে প্রেসিডেন্টকে জানাতে বলেন।

‘চাষী তখনই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে সংবাদটি দেন। রুম থেকে বেরিয়ে এসে চাষী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ঘটনা জানেন’। ওই দিন বঙ্গভবন ও ক্যান্টনমেন্টে যুদ্ধাবস্থার উত্তপ্ত পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় সংবাদটি জে. খলিল আর কাউকে শোনাননি, চেপে যান। তার কথা হলো, আমি ডিফেন্স স্টাফ প্রধান। আমার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টকে ঘটনাটি জানানো। আমি তাই করেছিলাম। অন্যান্যকে বলাবলি করতে যাব কেন?’

ওই বইয়ে ‘কুখ্যাত জেলহত্যা’ অধ্যায়ে এম এ হামিদ লেখেন: ‘২/৩ নভেম্বর গভীর রাতে সবার অজ্ঞাতে সংঘটিত হলো বিশ্বের এক জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সৈন্য গাড়ি করে সেন্ট্রাল জেলে পৌঁছায়। তারা ভেতরে ঢুকে অন্তরীণ আওয়ামী লীগ নেতাদের বাইরে নিয়ে যেতে চায়। জেলার আব্দুল আওয়াল সশস্ত্র সৈন্য দেখে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। এ নিয়ে তার সঙ্গে ঘাতক দলের অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটি হলো। তারা জোর করে ঢুকে যেতে চাচ্ছিল। কারাগারে পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল। ডিআইজি ও আইজি (প্রিজন্স) ছুটে আসলেন।

‘জেল গেট থেকে আইজি (প্রিজন্স) সরাসরি বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট মোশতাককে জেল গেটে মোসলেমউদ্দিনের আগমন ও ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা অবগত করেন। মোশতাক জলদগম্ভীর কণ্ঠে তাদের জেলে ঢোকার নির্দেশ দেন।’

ঘটনার ২১ বছর পর জেলহত্যার প্রামাণ্য দলিল উদ্ধার হয়। এটি হলো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আইজি (প্রিজন্স) নুরুজ্জামানের তৈরি করা প্রতিবেদন। গুরুত্বপূর্ণ এ ফাইলটি আইজি (প্রিজন্স)-এর কক্ষের ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৯৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তা বহু খোঁজাখুঁজির পর উদ্ধার হয়।

এতে দেখা যায়, খোন্দকার মোশতাক এবং মেজর রশীদ চার জাতীয় নেতাকে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দেন।

তাজউদ্দিন এবং নজরুল ইসলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ১নং সেলে ছিলেন। পাশের সেলে ছিলেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান। তাদেরকে তাজউদ্দিনের সেলে এনে জড়ো করা হয়। তারপর খুব কাছে থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়।

তাদের মধ্যে তিনজন সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান। তাজউদ্দিনের পায়ে ও হাঁটুতে গুলি লাগে, প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে তিনিও মারা যান। তিনি ‘পানি পানি’ বলে কাতরাচ্ছিলেন। কিন্তু ভীতবিহ্বল পরিবেশে কেউ এক ফোঁটা পানি এগিয়ে দিতেও সাহস পায়নি।

ঘটনাটি এতই বর্বরোচিত ছিল যে, মুখ খুলে কেউ কিছু বলতেও সাহস পায়নি।

সৈনিকদের কী প্রয়োজন পড়েছিল, একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের জেলের ভেতরে ঢুকে হত্যা করার?

খোন্দকার মোশতাক আহমদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এ চার নেতা। আর তারা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে অটল। কোনো কারণে যদি মোশতাকের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, তাহলে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাতে স্থলাভিষিক্ত না হয়, সে জন্য প্রতিপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্মূল করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন মোশতাক। রিসালদার মোসলেমউদ্দিন তার এ নীল নকশার বাস্তবায়ন করেন মাত্র।

কারাগারের অভ্যন্তরে এরকম নির্মম ঘটনা ইতিপূর্বে আর কখনও ঘটেনি। সমগ্র জেলখানায় নেমে আসে ভয়, ভীতি ও বিষাদের ছায়া।

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রম তার এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য, স্বাধীনতার প্রথম দশক বইয়ের ৮৯ পৃষ্ঠায় জেলহত্যাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে: ‘৪ তারিখ সকালবেলায় খবরে জানা যায়, ৩ তারিখ রাতেই জেলে আটককৃত সর্বজনাব নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান – এ চার নেতাকে রাষ্ট্রপতি মোশতাক, মেজর রশীদ ও ফারুকের আদেশে জেলের ভিতরেই নৃশংসভাবে ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের ট্যাংক রেজিমেন্টের কজন সৈনিক হত্যা করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, জেলখানায় সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের খবর ৩০ ঘণ্টা পর বাইরের লোকজনের কাছে প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক ও ফারুক-রশীদরা যখন ৩ তারিখের অভ্যুত্থানের খবর পায় এবং তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখনই এদের ধারণা জন্মে যে, এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেলে আটককৃত চার নেতাকে বের করে এনে রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাককে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার লেখা বিএনপি সময়-অসময় বইয়ের ৭০ ও ৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় বিতর্কিত ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনকে উদ্বৃতি করে লেখেন: ‘৪ নভেম্বর কেবিনেট বৈঠক ডাকেন প্রেসিডেন্ট মোশতাক। বৈঠক চলাকালে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়েন কর্নেল শাফায়েত জামিল, মেজর ইকবাল, কর্নেল আবদুল মালেক ও লে. কর্নেল জাফর ইমাম। চারদিকে অস্ত্র উঁচিয়ে তারা চিৎকার করতে থাকেন। মন্ত্রীদের লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করে ট্রিগারে হাত রেখে কেউ বলছে, “উই ওয়ান্ট খালেদ মোশাররফ। হি হ্যাজ টু বি মেইড চিফ অব স্টাফ, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, ইউ আর এ বাস্টার্ড স্যার, ইউ আর এ কিলার। ইউ উইল বি ফিনিশড।’

মহিউদ্দিন আহমদ এ বইতে আরও লিখেছেন: “কর্নেল শাফায়াত জেল হত্যাকাণ্ডের খবর পান ৪ নভেম্বর সকাল ১০টায়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি বঙ্গভবনে যান। সারা দিন বঙ্গভবনে বসে খালেদের দেনদরবারের কথা জেনে তিনি বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হন। শাফায়াত দেখলেন করিডরে মোশতাক খালেদকে উত্তেজিতভাবে বলছেন, ‘আই হ্যাভ সিন মেনি ব্রিগেডিয়ারস অ্যান্ড জেনারেলস অব পাকিস্তান আর্মি। ডোন্ট ট্রাই টু টিচ মি’।

“পাশে ওসমানী দাঁড়িয়ে আছেন। করিডরে মেজর ইকবাল ও অনেক সৈন্য ছিলেন। ইকবাল ততোধিক উত্তেজিত কণ্ঠে মোশতাককে বললেন, ‘ইউ হ্যাভ সিন দ্য জেনারেলস অফ পাকিস্তান আর্মি। নাও ইউ সি দ্য মেজরস অফ বাংলাদেশ আর্মি।’ এর মধ্যে সৈনিকেরা গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওসমানী বিপদ আঁচ করে বলে উঠলেন, ‘শাফায়াত, সেভ দ্য সিচুয়েশন। ডোন্ট রিপিট বার্মা।’ মেজর ইকবাল ও মোশতাকের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালেন কর্নেল শাফায়াত, ইকবালকে এক পাশে সরিয়ে দিলেন এবং মোশতাককে নিয়ে কেবিনেট কক্ষে ঢুকলেন।”

বইটিতে আরও লেখা হয়েছে, “ওই ঘরে মেজর জেনারেল খলিল বসে ছিলেন। শাফায়াত তাকে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আপনি চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ, প্রায় ৪০ ঘণ্টা হয়ে গেছে জেলখানায় জাতীয় নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, তারও ঘণ্টা কুড়ি পর দেশ ত্যাগ করেছে খুনিরা, আপনি এ সবই জানেন, কিন্তু আমাদের বলেননি কিছুই। এই ডিসগ্রেসফুল আচরণের জন্য আমি আপনাকে অ্যারেস্ট করতে বাধ্য হচ্ছি।

“শাফায়াত এরপর ধরলেন মোশতাককে। “স্যার, আপনি আর পদে থাকতে পারেন না। কারণ, আপনি একজন খুনি। জাতির পিতাকে হত্যা করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। এসব অপরাধের জন্য বাংলার জনগণ আপনার বিচার করবে। আপনি অবিলম্বে পদত্যাগ করুন। আপনার পদত্যাগের পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রেসিডেন্ট হবেন।”

৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি মোশতাক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ নিয়োগ করেন। খালেদকে মেজর জেনারেলের পদ দেয়া হয়। ওই রাতেই মোশতাক পদত্যাগপত্রে সই করেন। বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইটে মোশতাককে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৫ আগস্ট ও জেল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মোশতাকের প্রতিমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কে এম ওবায়দুর রহমান, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও নুরুল ইসলাম মঞ্জুরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

আইজি (প্রিজন্স) নুরুজ্জামানের জেলহত্যা রিপোর্ট

তখনকার আইজি (প্রিজন্স) নুরুজ্জামানের একটি চিঠি সংযুক্ত করে তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্তব্যরত ঢাকা বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন্স) খন্দকার আবদুল আওয়াল একটি রিপোর্ট পাঠান তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। নুরুজ্জামানের সেই চিঠিতে লেখা হয়েছে:

‘১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোর ৩টায় আমি বঙ্গভবন থেকে মেজর রশীদের একটি ফোন পাই। তিনি আমার কাছে জানতে চান, ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কোনো সমস্যা আছে নাকি। আমি জানালাম, ঠিক এই মুহূর্তের অবস্থা আমার জানা নেই। এরপর তিনি আমাকে জানালেন, কয়েকজন বন্দিকে জোর করে নিয়ে যেতে কয়েকজন সেনাসদস্য জেলগেটে যেতে পারে, আমি যেন জেল গার্ডদের সতর্ক করে দিই। সে অনুযায়ী আমি সেন্ট্রাল জেলে ফোন করি এবং জেলগেটে দায়িত্বে নিয়োজিত ওয়ার্ডারদের ম্যাসেজটি জেলারকে পৌঁছে দিতে বলি, যাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

‘৩/৪ মিনিট পর বঙ্গভবন থেকে আরেকজন আর্মি অফিসারের ফোন পাই। তিনি জানতে চান, আমি ইতোমধ্যে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গার্ডদের সতর্ক করে দিয়েছি কি-না। আমি ইতিবাচক জবাব দেওয়ার পর তিনি আমাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য জেলগেটে চলে যেতে বলেন। আমি তখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ডিআইজি প্রিজন্সকে ফোন করি। খবরটি জানিয়ে আমি তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জেলগেটে চলে যেতে বলি। দেরি না করে আমিও জেলগেটে চলে যাই এবং ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া জেলারকে আবারও গার্ডদের সতর্ক করে দিতে বলি। এরই মধ্যে ডিআইজিও জেলগেটে পৌঁছেন। বঙ্গভবন থেকে পাওয়া খবরটি আমি আবার তাকে জানাই।

‘এর পরপরই মেজর রশীদের আরেকটি ফোন পাই। তিনি আমাকে জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই জনৈক ক্যাপ্টেন মোসলেম জেলগেটে যেতে পারেন। তিনি আমাকে কিছু বলবেন। তাকে যেন জেল অফিসে নেয়া হয় এবং (১) জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, (২) জনাব মনসুর আলী, (৩) জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও (৪) জনাব কামারুজ্জামান – এই ৪ জন বন্দিকে যেন তাকে দেখানো হয়।

‘এ খবর শুনে আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চাই এবং টেলিফোনে প্রেসিডেন্টকে খবর দেয়া হয়। আমি কিছু বলার আগেই প্রেসিডেন্ট জানতে চান, আমি পরিষ্কারভাবে মেজর রশীদের নির্দেশ বুঝতে পেরেছি কিনা এবং আমি ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি আমাকে তা পালন করার আদেশ দেন।

‘কয়েক মিনিটের মধ্যে ৪ জন সেনাসদস্যসহ কালো পোশাক পরা ক্যাপ্টেন মোসলেম জেলগেটে পৌঁছায়। ডিআইজি প্রিজন্সের অফিসকক্ষে ঢুকেই তিনি আমাদের বলেন, পূর্বোল্লিখিত বন্দিদের যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে তাকে নিয়ে যেতে। আমি তাকে বলি, বঙ্গভবনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আমাকে কিছু বলবেন।

‘উত্তরে তিনি জানান, তিনি তাদের গুলি করবেন। এ ধরনের প্রস্তাবে আমরা সবাই বিমূঢ় হয়ে যাই। আমি নিজে এবং ডিআইজি প্রিজন্স ফোনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই। সে সময় জেলারের ফোনে বঙ্গভবন থেকে মেজর রশীদের আরেকটি কল আসে। আমি ফোনটি ধরলে মেজর রশীদ জানতে চান, ক্যাপ্টেন মোসলেম সেখানে পৌঁছেছেন কি-না। আমি ইতিবাচক জবাব দিই এবং তাকে বলি, কী ঘটছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তখন মেজর রশীদ আমাকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

‘আমি প্রেসিডেন্টকে ক্যাপ্টেনের বন্দিদের গুলি করার ইচ্ছার কথা জানাই। প্রেসিডেন্ট জবাব দেন, “তুমি ওদের কথা শোনো। রশীদ যা বলেছে, সেই মোতাবেক কাজ করো।” আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সরাসরি জড়িত।’

ওই প্রতিবেদনে ডিআইজি (প্রিজন্স) খন্দকার আবদুল আওয়াল লেখেন:

‘তখন আমরা আরও উত্তেজিত হয়ে যাই। ক্যাপ্টেন মোসলেম বন্দুকের মুখে আমাকে, ডিআইজি. প্রিজন্স, জেলার ও সে সময় উপস্থিত অন্যান্য কর্মকর্তা সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যেখানে উপরোল্লিখিত বন্দিদের রাখা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও তার বাহিনীকে তখন উন্মাদের মতো লাগছিল এবং আমাদের কারো তাদের নির্দেশ অমান্য করার উপায় ছিল না, তার নির্দেশ অনুযায়ী পূর্বোল্লিখিত ৪ জনকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করা হয় এবং একটি রুমে আনা হয়, সেখানে জেলার তাদের শনাক্ত করেন। ক্যাপ্টেন মোসলেম এবং তার বাহিনী তখন বন্দিদের গুলি করে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর নায়েক এ আলীর নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদল সবাই মারা গেছে কি-না, তা নিশ্চিত হতে জেলে আসে। তারা সরাসরি সেই ওয়ার্ডে চলে যায় এবং পুনরায় মৃতদেহে বেয়নেট-চার্জ করে।’





সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ





ebarta24.com © All rights reserved. 2021