1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

সুবর্ণজয়ন্তিতে উন্নয়নের অপার বিস্ময়

অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২২

রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পথচলা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি মাণষে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার স্ফুলিঙ্গ প্রজ্জ্বলিত হয় ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে। তিল তিল করে গড়ে তোলা বঙ্গবন্ধুর গণ-মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘ লালিত পংক্তিমালা পরিণত হয় এক মহাকাব্যে। ছিন্ন-ভিন্ন, যুদ্ধ বিদ্ধস্ত, বিপর্যস্ত একটি দেশকে সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দেশের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিতে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অভিধাপ্রাপ্ত দেশটি বঙ্গবন্ধুকণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে অর্থ, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জন করেছে প্রভূত উন্নতি।

বদলে যাওয়া সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে এক উদীয়মান অর্থনীতির দেশ, যা অনেকের জন্য এক অপার বিস্ময় ও অনুসরণীয় রোল মডেল। অর্ধশত বছরের পথপরিক্রমায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তানই এখন আর্থসামাজিক প্রায় সব সূচকেই বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে পরেছে। এমনকি, প্রতিবেশী দেশ ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরও যে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে মাত্র ৫০ বছরে। সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমেই বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবা খাতমুখী হয়েছে এ দেশের অর্থনীতি। জাতীয় প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মাথাপিছু গড় আয়, গড় আয়ু, নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, প্রাথমিকে শতভাগ ভর্তিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার গুটিকয়েক দেশ ছাড়া প্রায় সব দেশের চেয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সূচকগুলি বিস্ময়কর দ্রুত গতিতে অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এসডিজি লক্ষ্য অর্জনেও বাংলাদেশ রেখেছে অসামান্য অবদান।

আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব যে, বিগত বছরগুলিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলাংশে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পেছনেই রয়েছে বাংলাদেশ যদিও বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ৮৬তম। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৩৫.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষিত আছে। অন্যদিকে, মাত্র ৮.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। গত পাঁচ দশকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে রেমিট্যন্স। এটি দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে পৃথিবীর শীর্ষ দশে রয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পরেছে। বিগত সাড়ে চার দশকে ২১৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন তারা। সত্তর দশকের মাঝামাঝি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ছিল দুই কোটি ৩৭ লাখ ডলার যা ২০২২-২০২৩ (সেপ্টেম্বর) অর্থ বছরে দাড়িয়েছে ১৫৩৯.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৪৭.২ বিলিয়ন টাকা। সামষ্টিক অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান জাতীয় আয়ের ১২ শতাংশেরও বেশি।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬.১% প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সৃস্টি করেছে নতুন চমক। কোভিড-১৯ মহামারিতে বিশ্বব্যাপী যখন জাতীয় আয়ের নিম্নমুখি গতি, তখনো বাংলাদেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। দেখা যায় যে, ১৯৭৩ সালে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০ মার্কিন ডলার। ৫০ বছরের ব্যবধানে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৯১ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের বর্তমানে মাথাপিছু আয় মাত্র ১,৭৯৮ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে পাকিস্তানের তুলনায় যোজন যোজন এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ভারতের বর্তমান মাথাপিছু আয় ২,২৭৭ মার্কিন ডলার মাত্র। সুতরাং, মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছি আমরা। উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে রুপান্তরিত হয়ে বাংলাদেশ উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার অন্যতম একটি মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেলেছে।

বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে কৃষি খাতেও। বাংলাদেশ ধান, মাছ, সবজি, ফলসহ অন্যান্য রবি-শষ্য উৎপাদনের মধ্যদিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৪৬৫.৮৩ লক্ষ মে. টন খাদ্য-শষ্য উদপাদন করে বাংলাদেশ। ১৯৭২-৭৩ সালে জিডিপিতে কৃষির অবদান ৫৮.০৪% হলেও ২০২১-২২ সালে জিডিপিতে কৃষির অবদান ১১.৫০%। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমলেও মোট অবদান বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন কৃষি ক্ষেত্রে যুক্ত করছে নিত্য নতুন মাত্রা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন- ফেসবুক, ইউটিউব, বিভিন্ন পেইজে অথবা গ্রুপে আধুনিক কৃষি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইটগুলো বিপুল তথ্য ভাণ্ডারের উৎস হিসেবে কাজ করছে। ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে অনলাইন সার সুপারিশসহ অন্যান্য পরামর্শ গ্রহণ অনেক সহজ হয়েছে। গ্রামপর্যায়ে কৃষিবিষয়ক পরামর্শ সেবা প্রদানের জন্য কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকের একাউন্টে সরাসরি ভর্তুকির টাকা প্রেরণ, ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সরকারি গুদামে ধান-চাল ক্রয়, এছাড়াও কৃষিভিত্তিক অনেক ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ও সফটওয়ার ব্যবহার হচ্ছে, যেগুলো শেখ হাসিনা সরকারের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতার বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে কৃষি খাতের অবদান কমলেও শিল্পোন্নয়নে বাংলাদেশ অনেকটাই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে বিগত কয়েক দশক ধরে। পোশাকশিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় গত ১০ বছরে রপ্তানির চিত্র বদলেছে বাংলাদেশের। দেশের রফতানির প্রায় ৮১% আসে এ খাত থেকে। ২০১১-২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৮.৬% রপ্তানি বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে শিল্পখাতের অবাদান মাত্র ১০.৪ শতাংশ হলেও সময়ের পরিক্রমায় ২০২১-২২ অর্থ বছরে এসে তা দাড়িয়েছে ৩৫.৪৭ শতাংশ। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকে আগ্রহী করতে গড়ে তোলা হয়েছে অনেকগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব অঞ্চলে উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে তাদের শিল্প ইউনিট স্থাপন করছেন। পাশাপাশি জেলা-উপজেলায়ও বিসিকের মাধ্যমে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, বিভিন্ন কৃষি পণ্য, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক পণ্য, মেডিকেল পণ্যের মতো খাতগুলোর রফতানি বৃদ্ধি করতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করছে সরকার। এ খাতগুলোর রফতানি সক্ষমতাবৃদ্ধি, মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে ব্যাপক কার্যক্রম নেয়ার ফলে রফতানি বাণিজ্যের উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে।

অন্যান্য খাতের মত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও। মাতৃমৃত্যু হার ও শিশুমৃত্যু হার হ্রাস পেয়েছে। বিপুল জনগোষ্ঠী নিয়ে এ অর্জন সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয় ব্যাপার। ১৯৮৬ সালের জরিপ অনুযায়ী- প্রতি লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ৬৪৮ জন প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হতো। ২০১৫ সালে মাতৃমৃত্যু কমে দাঁড়ায় ১৮১ জনে। ২০২২ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে কমিয়ে ১২১ জনে আনার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) তা কমিয়ে ৭০ জনে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। টিকাদান কর্মসূচীতেও বাংলাদেশ রেখেছে সফলতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। যেখানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের ৮২% শিশু টিকা কর্মসূচীর আওতাভুক্ত হয়েছে যা পাকিস্তানে ৪৭.৩% মাত্র। গ্রমীণ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বর্তমান সরকার সারাদেশে ১৩ হাজার ৭৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে যার মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঘরের দোরগোড়ায় বসে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চাহিদার ৮০% এর বেশি ওষুধ আমদানি করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে চাহিদার প্রায় ৯৮% ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের ১৪৫টি দেশে বাংলাদেশ থেকে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। গত ছয় বছরে ওষুধ রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ থেকে ৩১ বিলিয়নে ডলারে।

যে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের প্রধান পূর্ব শর্তগুলির অন্যতম একটি হলো মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মানুষের সর্বজনীন গুণাবলি বিকাশের হাতিয়ার হিসাবে শিক্ষা অগ্রগণ্য। উন্নত দেশগুলো মানসম্মত ও সুষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে সাহিত্য, শিল্পকলা, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে দ্রুতগতিতে সাফল্য অর্জন করে চলেছে। বাংলাদেশও সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অবিরত। তারই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের অন্তর্ভূক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকাংশে। এখন প্রাথমিক স্কুলে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে প্রায় ৫৪ শতাংশ এবং এই অর্জনের ধারা অব্যাহত আছে। এখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়ে চলছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাবৃদ্ধি, ঝরেপড়া রোধ, শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রী সমতা বিধানের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় উপবৃত্তি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা অনলাইনে প্রদান করছে। বিগত দশকের অন্যতম একটি অর্জন হলো জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন। এতে কারিগরী শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যা দক্ষ জনবল সৃষ্টি ও দক্ষ জনবল রপ্তানী বৃদ্ধিতে ব্যপক অবদান রাখবে। দেশে আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতেও এটি অসামান্য ভূমিকা রাখবে।

একটি দেশের নৈতিক শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ে ওঠে প্রাথমিক শিক্ষার হাত ধরে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার ভিত শক্ত করতে সরকার ২০১৩ সালে ২৬ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছে। এ পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে ১ লাখ ৩৫ হাজার প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বিস্তার, মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত দশকে যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। পাসকৃত ক্বওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের কর্মক্ষেত্রের কিছু খাতও নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আলিয়া ও কামীল মাদ্রাসাগুলির আধুনিকায়ন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন ২০১৩ সালে। সরকার গৃহীত এসব উদ্যোগ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জংগীবাদ নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমতা ও সাম্যভিত্তিক সুষ্ঠু সমাজ গঠনে সুদূর প্রসারী ভূমিকা রাখবে।

বিগত দশক থেকে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে কিছু আমূল পরিবর্তন। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধ্বংস করেছিল রাস্তাঘাটসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ ও কালভার্ট। দেশ স্বাধীনের পরই যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করেন দেশ পুনর্গঠনের কাজ, তখন সর্বাধিক গুরুত্ব পায় যোগাযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক পুনর্বাসন ও উন্নয়ন। বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের যোগাযোগ খাত দ্রুতগতিতে পুনর্বাসিত হতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক খাতের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে গত ১০ বছরে যোগাযোগ খাতে গ্রহণ করা হয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু, এমআরটি ও কর্ণফুলী টানেলসহ বেশকিছু মেগা প্রজেক্ট। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সদ্য সমাপ্ত পদ্মা সেতু ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য, ১৮ দশমিক ১০ মিটার প্রস্থ এবং চার লেনবিশিষ্ট এ সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেতু। এছাড়াও অন্যান্য প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত হলে সমগ্র বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নকল্পে দেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হিসাবে ঘোষণা করেছেন। অন্যান্য উন্নয়নের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশকে অনেকটা এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। তথ্যপ্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি যেমন—আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড, সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড এবং গার্টনারসহ বেশ কিছু সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। এই উন্নয়নের নেপথ্যে আইসিটি বিপ্লবের স্থপতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের অবদানও অনস্বীকার্য। তাঁদের হাত ধরেই দেশ এখন থ্রি-জি ফোর-জি পেরিয়ে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালুর দ্বারপ্রান্তে। ২০১৮ সালের মে মাসে নিরক্ষরেখায় স্থাপিত হয় দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) বঙ্গবন্ধু-১। এর মধ্য দিয়ে অর্জনের তালিকায় এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছুঁইয়ে ফেলে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এই স্যাটেলাইট এখন মহাকাশে সক্রিয় থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কাজ বৈদেশিক নির্ভরতা মুক্ত করে সুসম্পন্ন করে চলছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে ব্যাপক হারে। জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও সেবার ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মোকাবিলায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি বড় অংশ ফ্রিল্যান্সার। দেশে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। বর্তমানে আইসিটি খাতে রপ্তানি ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অনলাইন শ্রমশক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ফ্রিল্যান্সাদের আউটসোর্সিং থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে।

কৃষি, শিল্প, সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনির্মানে অভূতপূর্ব উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সূচকেও ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে বাংলাদেশে। কিছু কিছু সামাজিক সূচকে গত দশ বছরে শুধু পাকিস্তান কেন ভারতকেও পিছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৭ বছর, পাকিস্তানের ৫৪ বছর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু দাঁড়ায় ৭২.৩ বছর, ভারতে ৬৯.৪ এবং পাকিস্তানের ৬৭.১ বছর। গড় আয়ুতে আমরা ভারতের থেকেও এগিয়ে আছি।

বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের মানবসম্পদ সূচকে দেখা যায়, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম আর পাকিস্তান ১৩৪তম। এটিতে ভারতও আমাদের পেছনে- ১১৫তম। শিক্ষার হারের দিক থেকে পাকিস্তান থেকে অনেকটা এগিয়ে বাংলাদেশ। যদিও শিক্ষার হারের দিক থেকে ভারত থেকে সামান্য একটু পিছিয়ে বাংলাদেশ। ভারতের ৭৪.৪%-এর বিপরীতে বাংলাদেশের শিক্ষার হার ৭৩.৯% যেখানে পাকিস্তানে শিক্ষার হার মাত্র ৫৯.১৩%। যদিও উচ্চশিক্ষার মান বিবেচনায় পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্ট ও সমীক্ষা অনুযায়ী অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সূচকে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ, এছাড়া গণতন্ত্রের সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে ভারত কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের থেকে ভালো।

২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পৃথিবীর ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব সূচকে ৪২তম। বাংলাদেশ এগিয়ে আছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও। ১৯৭১ সালে যেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫০ লাখ এবং পাকিস্তানের ৬ কোটি ৫০ লাখ, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬.৫১ কোটি আর পাকিস্তানের ২৩ কোটি ৫৮ লাখ। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশ নানা ঘাত-প্রতিঘাতে পাড়ি দিয়েছে অনেকটা পথ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেগেছে কল্পনাতীত সাফল্যের ছোঁয়া। তলাবিহীন ঝুড়ি আজ পরিপূর্ণ হয়েছে অগনিত উন্নয়ন সম্ভারে। তবুও, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মাতৃভূমির প্রতি আরও অধিকতর দায় ও টান অনূভব করতে হবে আমাদের হৃদয়ের গহীনে—লোকচোক্ষুর দৃষ্টিনন্দনের জন্য নয়, প্রকৃতার্থে কিছু করার মানসে। কেননা, ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের যেতে হবে আরও বহুদূর…।

লেখক : ড. মো. কামরুজ্জামান – অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ - জাতীয় সংবাদ