বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন

টিউলিপ সিদ্দিকের বক্তব্য ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের উগ্রপন্থি তোষণ

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : শুক্রবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৭

আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল

কিছুদিন আগের সংবাদ, স্পেন হামলায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্য প্রবাসীর অর্থায়ন। গতকাল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসাকে হত্যার লক্ষ্যে জঙ্গিদের একটি পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিয়েছে যুক্তরাজ্য পুলিশ। হত্যা পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা সন্দেহে গত সপ্তাহে নাইমুর জাকারিয়া রহমান নামে বাংলাদেশী বংশোদ্ভত এক বৃটিশ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্বাভাবিক পর্যবেক্ষণে বলা যায়, মানবাধিকারের নামে ৭১-এর গণহত্যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, জামায়াতে ইসলামী ও হিজবুত তাহরির সহ বহু উগ্রপন্থিদের স্থান দিয়েছে যুক্তরাজ্য। সুতরাং তাদেরকে এ অদূরদর্শিতার মূল্য দিতে হবে।

যুক্তরাজ্যের জন্য আশঙ্কাজনক বিষয়টি উল্লেখের কারণ, লেবার পার্টির সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিকের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অনেক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। দুঃখ প্রকাশের পরও এ চর্চা অব্যহত রয়েছে। চ্যানেল ফোর নিউজের রিপোর্টার এলেক্সের জবাবে তিনি প্রথমেই বলা হয়েছিল, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ নন। মীর কাশেম বা তার আরমানও বৃটিশ নন। এমন নয় যে তিনি মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। সচেতন বলেই ইরানের কারাগারে আটক একজন নারীর মুক্তি দাবিতে ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু বৃটিশ জনপ্রতিনিধি হয়ে শুধুমাত্র অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিষয়ে কথা বলা কূটনৈতিক সৌজন্য বিবর্জিত বলে গণ্য হত।

বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, টিউলিপ সিদ্দিক কি এমন কারো পক্ষে কথা বলতে পারেন যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত? তিনি কি এমন একজনের কথিত অপহরণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন যে বাংলাদেশ ও দেশের পতাকাকে অবমাননা করে? অন্যতম শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলী ১৯৭১-এ আল বদরের থার্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন। প্রশ্ন আসতে পারে, পিতার অপরাধে পুত্র কেন দায়ী হবে! কাশেম পুত্র মীর আহমদ ওরফে আরমানের হৃদয়েও পিতার মতোই পাকিস্তানেরই প্রতিচ্ছবি। আর এর প্রমাণ পাবেন তার ফেসবুক প্রোফাইলে। সেখানে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে সেট করা একটি ছবি আছে যা বাংলাদেশের পতাকার আইএস ভার্সন, এবং পতাকায় কালো লেবেল সেটে দেয়া হয়েছে যা বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করার প্রতিফলন।

টিউলিপকে কেন্দ্র করে যে ইস্যু তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বা হচ্ছে তা মোটেই সাধারণ ও স্বাভাবিক নয়। পরিকল্পিতভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। একটি বিষয়ে সন্দেহ বাড়ছে যে, আহমেদ গুম হওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পিত নাটক। অন্তত সার্বিক বিচার বিশ্লেষণ সেটিই নির্দেশ করছে।

আলোচিত এ ঘটনার কিছু বিষয় উল্লেখযোগ্য।

১. আহমেদ প্রসঙ্গে সাংবাদিক এলেক্সের প্রশ্নে টিউলিপের বিব্রত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে না। কিন্তু যদি বলা হয়, চ্যানেল ফোর নিউজের প্রযোজক ডেইজি এবং রিপোর্টার এলেক্স বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা সম্পর্কে অবগত। যদি বলা হয়, দুবছর আগেও ডেইজি বাংলাদেশ সফর করেছিল গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের ইস্যু কভার করতে, তাহলে কি এ ঘটনার সমীকরণ সহজ থাকে?
২. টিউলিপ বাংলাদেশী নন। বাংলাদেশী দাবি করা আবেগ সংশ্লিষ্ট হতে পারে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি জন্মসূত্রে বৃটিশ এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেননি। তবু তার শেকড় বাংলাদেশে বলেই মীর কাশেম সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে, তিনি আরমানের মুক্তির দাবি করেছেন, তাহলে দুটি ইস্যু তৈরি করা হতো।

এক. এটি হতো বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান, কারণ আরমানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে তার সত্যতা নেই। কিন্তু এতটা আস্থার সাথে কিভাবে দাবি করেছে যে, একটি ফোন কলেই আরমানকে ফিরে পাওয়া যাবে? ফরহাদ মজহার, সালাউদ্দিন ও হারিস চৌধুরীর মত অনেকেই গুম নাটক করেছে। ৫ই মে হত্যা করা হয়েছে এই মর্মে তালিকাভুক্ত অনেককে জীবিত পাওয়া গেছে অনেক মাস পরে। কাশেম পুত্রের ফেসবুক প্রোফাইলে দেশী-বিদেশী কয়েকজনের ছবি রয়েছে যারা জঙ্গি হিসেবে সন্দেহ করার মতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটাক্ষ ছাড়াও আইএস বা হামাসের মত কোনো জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত থাকার মত বেশ কিছু একটিভিটি দেখা যায় আরমানের প্রোফাইলে। উগ্রপন্থি একটি দলের নেতার সন্তান হিসেবে বাংলাদেশের অনেক তরুণের মত সে যে আইএস-এ যোগ দেয়নি তার নিশ্চয়তা কি?

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সাথে আহমদের সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, লিংকের ছবিগুলো দেখলে অনুধাবন করতে পারবেন।

কাশেম দেশের শীর্ষ ধনীদের একজন। কোনো সংস্থা অপহরণ করলে তার বাসার সিসিটিভি ফুটেজ কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না?

দুই. যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যাদের সহযোগিতায় ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের কারণে দুই লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, সেই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর বা তার সন্তানের পক্ষ নিয়ে কথা বললে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধা জানানো হত।

৩. প্রতিবেদক এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত। টিউলিপকে আক্রমণাত্বকভাবে বার বার একই বিষয়ে প্রশ্ন করার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত ছিল। প্রযোজক একজন সন্তান সম্ভবা মা। তিনি কি এমন গোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলতে পারে যাদের কারণে লক্ষ লক্ষ সন্তান পিতৃহারা হয়েছিল এবং হাজার হাজার যুদ্ধ শিশু, বাবা-মা ও পরিবারের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে অনিশ্চিত জীবনের স্রোতে মিশে গিয়েছিল! এর কোনকিছুই ডেইজির অজানা নয়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিবেদক। একটি ভিডিও ক্লিপ।

এখানে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জনসভায় এই মর্মে ঘোষণা হয় যে, অভিযুক্ত রাজাকাররা পাকিস্তানকে ভালবেসে আল বদর, আল শামস বাহিনী গঠন করেছে ও যুদ্ধ করেছে। জামায়াতের মুখপাত্র স্বীকার করছে যে, রাজাকারেরা পাকসেনার ভূমিকা পালন করেছে এবং তারা দায়ী হলে পাকসেনাও একইভাবে দোষী, তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। রাজাকারদের সহযোগিরা যদি মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি প্রদান করে, অন্যদিকে কোন মিডিয়া যদি সেই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাহলে কি সেই সংবাদ-মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা কোথায় থাকে!

টিউলিপ মন্তব্য না করে যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, যদি আহমেদ সম্পর্কে কিছু বলতেন তবে তা হতো বাংলাদেশের জনমতকে আঘাত করা। উপরন্তু মীর আহমেদকে নিয়ে যে গুম প্রচারণা চলছে তা সত্যি হিসেবে উপস্থাপন করে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হত। সবাইকে খুশী করা সম্ভব নয়। ১৬ বছর বয়সে রাজনীতি শুরু করা বৃটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিক কোনো মন্তব্য না করায় অন্তত আমাদের আশাহত হওয়ার মত কোনো ঘটনা ঘটেনি। চ্যানেল ফোরের মত সংবাদ মাধ্যমকে আমরা অবশ্যই প্রশ্ন করতে পারি, বৃটিশ মিডিয়ার কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সহযোগী ভূমিকা পালন করা উচিত?


আরও সংবাদ