শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৮:০৮ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ কোন পথে যাবে?

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

শাহরিয়ার কবির:

তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের মূল্যে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। ১৯৭১—এর মুক্তিযুদ্ধকালে শুধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নয়, যারা এদেশে ইসলামের নামে রাজনীতি ও সন্ত্রাসে বিশ্বাসী তারা সবাই স্মরণকালের নৃশংসতম গণহত্যা ও নারীধর্ষণসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান মদদদাতা ও খেদমতগার ছিল।

জামায়াতে ইসলামী এদের ভেতর প্রধান দল হলেও হিংস্রতায় নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ, পিডিপি কেউ কম ছিল না। তাদের ঘাতক বাহিনী আলবদর, আলশামস, রাজাকার, শান্তি কমিটি ও মুজাহিদ বাহিনীরা গণহত্যা ও নির্যাতন কী ধরনের নৃশংসতা প্রদর্শন করেছিল দেশে ও বিদেশে তার হাজারও বয়ান আছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার প্রধান সহযোগীরা এ কারণেই ১৯৭২—এর সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি ধর্মের নামে রাজনৈতিক দল এবং অন্য কোনো সংগঠন প্রতিষ্ঠার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।

এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ধর্মের নামে গণহত্যাকারীদের বিচারও আরম্ভ করেছিলেন। গণহত্যাকারী পাকিস্তানের এ দেশীয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দোসরেরা ’৭১—এর শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি কখনও ভুলতে পারেনি। এই চরম গ্লানি ও ক্ষোভ তাদের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করেছে, যা তারা বাস্তবায়ন করেছে এককালে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই—এর কর্মকর্তা জেনারেল জিয়াউর রহমানের দ্বারা।

আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশতাকদের জিয়া ব্যবহার করেছিলেন মহাভারতের শিখণ্ডির মতো। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করার পরই জিয়ার কাছে খন্দকার মোশতাকের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতায় এসে জিয়া কীভাবে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তান বানাবার জন্য সংবিধান থেকে রাষ্ট্রের মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের দর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা বাদ দিয়ে এর তথাকথিত ইসলামিকরণ তথা পাকিস্তানিকরণ করেছেন এ ইতিহাস কারও অজানা নয়।

বাংলাদেশের মূল সংবিধান গ্রহণকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এই সংবিধান তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে লেখা। সংবিধানের মূলনীতি বাতিল করার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বদল করে এর গায়ে সাম্প্রদায়িকতার কালিমা লেপন এবং জিন্নাহ্ সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বকে সঠিক প্রমাণ করা।

’৭১—এর গণহত্যাকারীদের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন ধর্মের নামে হত্যা—সন্ত্রাস বন্ধের পাশাপাশি ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য। জিয়া তার অবৈধ ক্ষমতাদখলকে বৈধতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানের মতো ধর্মের নামে রাজনীতি চালু করেছিলেন। তখন থেকে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের যে গাঁটছড়া তা ক্রমশ মজবুত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জামায়াতের আরেক হিংস্র, কদর্য চেহারা হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিশ গং।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী এই অপশক্তির ত্র্যহস্পর্শে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানী ঢাকায় ঘটেছিল হেফাজতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিএনপি—জামায়াত গং—এর মহাসন্ত্রাসী তাণ্ডব। হালে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দিয়ে মাঠগরমকারী জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসী মামুনুল হক ২০১৩ সালে হেফাজত—জামায়াত—বিএনপির ক্ষমতাদখলের ষড়যন্ত্রের অন্যতম কুশীলব হিসেবে জুনায়েদ বাবুনগরীদের সঙ্গে জেলও খেটেছিলেন।

রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের কোথাও কোনো ভাস্কর্য থাকতে পারবে না এটা মৌলবাদী মোল্লাদের নতুন আবদার নয়। হেফাজতের ১৩ দফায় এটা বলা আছে। হেফাজতের নামে মাঠে নামার অনেক আগে ২০০১ সালে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ওসামা বিন লাদেনের ছবির ব্যানার ফেস্টুন উঁচিয়ে শ্লোগান দিয়েছিল ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’তালেবানদের আমীরউল মুমেনিন খলিফা মুল্লা উমরের নির্দেশে ২০০১ সালেই আফগানিস্তানের বামিয়ানে দু’হাজার বছরের পুরনো বিশ্বের বৃহত্তম দণ্ডায়মান বুদ্ধের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল বিশ্ব—জনমত উপেক্ষা করে। এর কয়েক মাস পরই মুল্লা উমরের সরকারের পতন ঘটেছিল।

মুল্লা উমরের তালেবানরা শুধু বামিয়ানের বৌদ্ধ মূর্তি ভেঙে ক্ষান্ত হয়নি। তারা কাবুল ও কান্দাহারের জাদুঘরগুলোর প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ভেঙেছে কিংবা লুট করেছে। ২০০১ সালের জুন মাসে ইসলামাবাদে দেখেছি কোহ্সার মার্কেটের সামনের ফুটপাতে আর ফাঁকা জায়গায় তালেবানরা জাদুঘরের অমূল্য প্রত্নসম্পদ লুটের মাল হিসেবে হাট বসিয়ে বিক্রি করছে। আর পশ্চিমের শেতাঙ্গ পর্যটকরা চোখ—কান বুঁজে সেসব কিনছে।

আফগানিস্তানে তালেবানরা যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত সমাজতন্ত্রী নজিবউল্লাহ্ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল তখন জামায়াত সমর্থিত খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজারেরও বেশি মৌলবাদী সন্ত্রাসী তরুণ আফগানিস্তান গিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান হয়ে তথাকথিত তালেবান জেহাদে শরিক হওয়ার জন্য। জেহাদ শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানের আইএসআই এবং পলায়নপর তালেবান নেতারা এদের ছিন্ন পাদুকার মতো পরিত্যাগ করেছিল।

এদের একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০০২ সালের ডিসেম্বরে কাশিমপুর জেলে। আমার কাজকর্ম করার জন্য ইয়াজুদ্দিনকে দেয়া হয়েছিল, কার্যত নজরদারি করার জন্য। বিশালদেহী যুবক ইয়াজউদ্দিন ছিল অত্যন্ত সরল প্রকৃতির। ও কাজের সন্ধানে করাচি গিয়েছিল। অনেক দিন বেকার থাকার পর খবর পেল তালেবানদের জেহাদের খাতায় নাম লেখালে সওয়াব কামানোর পাশাপাশি বেতনও পাবে। আর জেহাদে শহিদ হলে শুধু নিজে নয় বাপ—দাদা সাতপুরুষের বেহেশতে যাওয়ার টিকেট পাওয়া যাবে।

আরেকজন একটু কমাণ্ডার প্রকৃতির ইউনুসের সাক্ষাৎকার আছে আমার ‘জেহাদের প্রতিকৃতি’ প্রামাণ্য চিত্রে। ইউনুস বলেছে আফগান জেহাদ শেষ হওয়ার পর প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি ‘মুজাহিদীন’ দেশে ফেরত এসে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হয়েছে। বাকিরা কাশ্মীরে, চেচনিয়া আর প্যালেস্টাইনে জেহাদ করার জন্য গিয়েছে। ইউনুসরা হাটহাজারীর মতো মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালে কীভাবে হরকতুল জিহাদের সদস্য হয়েছে, কীভাবে জামায়াত নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তাদের প্রাথমিক ট্রেনিং দিয়েছে সবই ইউনুস বলেছে। জামায়াতের এক নেতা তখন হাদিসের উল্লেখ করে ওদের বলেছিলেন, মহানবীর নির্দেশ অস্ত্র শিক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে চীনেও যেতে হবে।

বাংলাদেশি তালেবানরা ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে ভাঙার প্রেরণা পেয়েছে আফগানিস্তানের মুল্লা উমরের ফতোয়া থেকে। মুল্লা উমর নিজেকে মহানবীর প্রতিনিধি এবং এ কারণে ‘আমিরউল মুমেনিন’ ঘোষণা করেছিলেন। ইয়াজউদ্দিন এক পর্যায়ে মুল্লা উমরের দেহরক্ষীর মর্যাদা অর্জন করেছিল সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে এক আত্মঘাতী যুদ্ধে সাফল্যের জন্য। ও নাকি মুল্লা উমরকে দেখেছে মহানবীর জোব্বা পরিহিত অবস্থায়।

বাংলাদেশি তালেবানদের নির্দিষ্ট কোনো সংগঠন নেই। খালেদা—নিজামীদের জমানায় তারা দেশে ফিরে বিভিন্ন নামের জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছে। ২০০৮ সালের অক্টোবরে তাদের হুমকির কারণে বিমানবন্দরের সামনের সড়কদ্বীপ থেকে লালন ফকিরসহ পাঁচজন বাউলের ভাস্কর্য অপসারণ করে সরকারি কতৃর্পক্ষ। এরপর এক মাস পর উলামায়ে আঞ্জুমানে বায়নিয়াৎ—এর জঙ্গি তালেবানরা মতিঝিলে বাংলাদেশ বিমানের সামনে থেকে বিশাল বলাকা ভাস্কর্য ভেঙে টুকরো টুকরো করেছিল। পুলিশ নিয়ম মতো বাধা দিয়েছিল, ওরা যথারীতি সে বাধা মানেনি।

এরপর আমরা দেখেছি ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মহাজোট যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিন চতুর্থাংশের বেশি ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে ’৭১—এর গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করে, তখন জামায়াত—বিএনপি এবং তাদের জোটের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সঙ্গীরা কী ভয়ঙ্কর ভাষায় এই বিচার, দেশের আমাদের বিচার ব্যবস্থা এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছিল।

বাংলাদেশকে মুল্লা উমরের আফগানিস্তানের মতো মনোলিখিক মুসলিক রাষ্ট্র বানাবার উদ্দেশ্যে তারা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে হামলা করেছিল কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধপল্লীতে। নিরীহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বহু বাড়িঘর মন্দির তাদের প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। বহু বৌদ্ধ মূর্তি ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি যারপরনাই মলিন করেছে।

২০১৩ সালের শুরু থেকেই পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই—এর মদদে হেফাজত—জামায়াত—বিএনপি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে উৎখাতের জন্য বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র করছে। এর একটির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি ’৭১—এর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নেতা এবং বাংলাদেশি তালেবানদের প্রাণপ্রিয় ওয়াজ ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে।

জামায়াত আগে থেকেই তৈরি ছিল। সারা দেশে হিন্দু অধ্যুষিত বিভিন্ন অঞ্চলে তারা তিন দিন আগে থেকেই ওয়াজ মাহফিলের নামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছিল। কারণ সাঈদীর মামলায় সরকার পক্ষের ২৯ জন সাক্ষীর ভেতর ২ জন ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু ছিলেন। যদিও যে অপরাধে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল সেই অভিযোগে কোনো হিন্দু সাক্ষী ছিলেন না, তারপরেও জামায়াতের সন্ত্রাসীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। হামলাকারীদের শ্লোগান ছিল ‘তোদের সাক্ষীর জন্য সাঈদী হুজুরের ফাঁসি হয়েছে।’ ‘বাংলাদেশে কোনো হিন্দু রাখব না।’ ‘মালাউন যদি বাঁচতে চাস, এই মুহূর্তে ভারতে যা’ ইত্যাদি।

সেই সময় আমরা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে আক্রান্ত কিছু হিন্দু অধ্যুষিত জনপদে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আক্রমণের ভাষা, ধরন ঠিক ’৭১—এর মতো। বাংলাদেশে হিন্দু বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু থাকতে পারবে না। দুই উর্দিপরা জেনারেল জিয়া ও এরশাদ সংবিধানের মাথায় ‘বিসমিল্লাহ…..’ বসিয়ে, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ঘোষণা করে জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাস উত্থানের জমি আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সামরিক শাসনকে অবৈধ এবং সামরিক শাসকদের সংবিধান সংশোধন অবৈধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রে চার মূলনীতি পুনঃস্থাপন করলেও ‘বিসমিল্লাহ…’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ রেখে দিয়েছে, যা জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দুঃসাহসের আগুনে ইন্ধন জুগিয়েছে।

২০১৩—এর ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ—এর চত্ত্বরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক তারুণ্যের মহাজাগরণে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও সরকার জামায়াত—হেফাজতের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। হেফাজতপ্রধান আহমদ শফী জামায়াতিদের বিভিন্ন দৈনিকের প্রথম পাতায় আমাদের নাস্তিক মুরতাদ ঘোষণা করে যখন প্রধানমন্ত্রীকে চরম বিদ্বেষপূর্ণ খোলা চিঠি লিখেছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এপ্রিল মাস জুড়ে হেফাজতিরা সারা দেশে মাদ্রাসার ছাত্র—শিক্ষকদের নিয়ে বড় বড় সমাবেশ করেছেন তাদের ১৩ দফা ও অন্যান্য দাবির পক্ষে, যার অন্যতম ছিল রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কোনো ভাস্কর্য থাকতে পারবে না, দেশ পরিচালনা করতে হবে কোরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে, পাকিস্তানের মতো ‘ব্লাসফেমি’ আইন চালু করতে হবে, কাদিয়ানিদের কাফের ঘোষণা করতে হবে ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত শাহবাগের মহা গণজাগরণে ভীত হয়ে হে—জা—বি’রা (হেফাজত—জামায়াত—বিএনপি) ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মহাসমাবেশ ডেকেছিল। হেফাজতপ্রধান আহমদ শফী চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সদর দফতর থেকে হেলিকপ্টারে উড়ে ঢাকা এসেছিলেন মাদ্রাসার ছাত্রশিক্ষকদের সেই মহাসমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য। চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় হেফাজত নেতারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধান এবং আমাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিলেন। বিকেলে বোঝা গেল তাদের আসল চেহারা।

টেলিভিশনে আমরা দেখলাম হেফাজতের প্রতিহিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র। সরকারি—বেসরকারি ভবন, পরিবহন, সড়কদ্বীপের গাছ এমনকি বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সারি সারি ধর্মীয় বইয়ের দোকান সব কিছু ভস্মিভূত হয়েছে। তাদের আগুনের লেলিহান শিখায় শত শত কোরআন পুড়েছে। হেফাজতের এই অগ্নিকাণ্ডে পেট্রল ঢেলেছিলেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া। ঢাকাবাসীকে তিনি তখন আহ্বান জানিয়েছিলেন হেফাজতিদের মহাতাণ্ডবে যোগদানের জন্য। সেদিন রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে না গেলে পরদিন সরকারের যে পতন ঘটত এ কথা হেফাজত নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী গ্রেফতারের পর পুলিশি হেফাজতে কবুলও করেছিলেন।

ইদানীং খেলাফত মজলিশের হেফাজতি নেতা মামুনুল হক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার যে ঘোষণা দিয়েছেন তাকেও তখন মতিঝিলের মহাসন্ত্রাসের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল। শতাধিক হেফাজত নেতা গ্রেফতারের পর অবশিষ্ট হে—জা—বি নেতারা আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। তারপরই আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম হেফাজতের সঙ্গে সরকারের নেতাদের দহরম মহরম। হেফাজত নেতাদের সরকারি জমি ও অর্থ দিয়ে বশীভূত করার নানা অপকৌশল। এ ধরনের আপসে যে কোনো কাজ হয় না তার প্রমাণ হেফাজতিদের সাম্প্রতিক আস্ফালন।

সরকারের নীতি নির্ধারকেরা তখন ভেবেছিলেন এভাবে তারা হেফাজতিদের বিএনপি—জামায়াতের খপ্পর থেকে বের করে আনবেন। সরকারি পারিতোষিকের কারণে হেফাজত কয়েক বছর মাঠে থাকেনি। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলে নেতাদের জেল থেকে বের করে এনে আবার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে কখনও সুপ্রিম কোর্ট থেকে লেডি জাস্টিসিয়ার ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে, কখনও আহমদীয়া সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষদের উপর হামলা করে, কখনও তরুণ লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও ভিন্ন জীবনধারায় বিশ্বাসীদের নাস্তিক ও ইসলামের দুষমন আখ্যা দিয়ে হত্যার মাধ্যমে।

হেফাজতের দাবি মেনে সরকার সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্য সরিয়ে পেছনে নিয়ে গিয়েছে, আহমদীয়া কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার সময় পুলিশ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে; এমনকি ২০১৫ সালে তরুণ ব্লগারদের নাস্তিক বলে যখন একের পর এক যখন হত্যা করা হচ্ছিল তখন সরকারের কোনো কোনো নেতা বলেছেন, ওরা এরকম লেখে কেন? সরকারি নেতারা কিন্তু কখনও বলেননি হে—জা—বি’রা কোন দুঃসাহসে তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে লেখা সংবিধানকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে, এমনকি করোনা মহামারিকালে সকল স্বাস্থ্যবিধি ও নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করে যখন এই মুজিববর্ষে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়ার চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে, যা কিনা সংবিধান অবমাননার শামিল, তখনও তাদের বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ নেতাদের টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করতে দেখিনি।

পুরনো বাংলা প্রবাদ আছে, মৌলবাদের কালসাপকে কখনও দুধকলা খাইয়ে পোষ মানানো যায় না, সুযোগ পেলেই তারা ছোবল মারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মৌলবাদের আগুন নিয়ে যারাই খেলতে গিয়েছে তারাই তাদের পতন ও ধ্বংস ডেকে এনেছে। হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতা করতে করতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখন ওহাবি মৌলবাদীদের ভাষায় কথা বলেন। যারা নিজেদের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধিতার ঠিকেদার ভাবেন সেই বামরা দূরে বসে তামাশা দেখছেন, আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সম্ভাবনায়।

জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কার্যক্রম যতটা দৃশ্যমান তাবৎ বামদের ভেতর তার সিকিভাগও দেখিনি। নির্মূল কমিটির আন্দোলনের বয়স তিরিশ বছর হতে চলেছে। আমরা রাস্তায় আছি পাঁচ দশক ধরে। হেফাজত—জামায়াতের উত্থান সম্পর্কে সরকার নিরব থাকলেও আমাদের অবশ্যই এই অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা যে যেখানে আছি প্রত্যেকে আমরা তিরিশ লাখ শহিদের রক্তের কাছে ঋণী। তারা জীবন দিয়ে দেশটা স্বাধীন করেছিলেন বলে আমরা ২০৪১ সালে উন্নত দেশের পংক্তিতে স্থানলাভের কথা বলতে পারছি। বঙ্গবন্ধু এই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না করলে আমরা এখনও বেলুচ, সিন্ধি আর পাঠানদের মতো পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকদের বুটের তলায় থাকতাম। হেফাজত—জামায়াত—বিএনপির এজেন্ডা হচ্ছে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তানে রূপান্তরিত করা।

সরকারকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ চান, না হেফাজতের হাত ধরে দ্বিতীয় পাকিস্তানের পথে হাঁটতে চান। আমরা আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক মানবতার জমিন থেকে এক চুলও সরে আসতে পারি না।

তিরিশ লাখ শহিদ এবং বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক শ্রেয়। রবীন্দ্রনাথের গানের মতো আমার সকল নিয়ে সর্বনাশের আশায় আমরা বসে থাকতে পারি না। বাংলাদেশ থেকে জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূল না হলে দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

লেখক: সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা।


আরও সংবাদ