1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
জয় কি জওয়াহেরলাল হতে পারবেন? আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী - ebarta24.com
  1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
জয় কি জওয়াহেরলাল হতে পারবেন? আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী - ebarta24.com
বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৮:২৬ অপরাহ্ন

জয় কি জওয়াহেরলাল হতে পারবেন? আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

সম্পাদনা:
  • সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২০

সজীব ওয়াজেদ জয়ের জয় হোক। অন্ধকার গিরিগুহায় হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো তাঁর কথা। হেফাজতিদের হুংকারের মুখে ক্ষমতাসীন মহলের অনেকের কণ্ঠে যখন আপসের সুর, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কণ্ঠেই শুধু শোনা গেল একটি স্পষ্ট কথা—‘হেফাজতিরা নতুন রাজাকার’। এর আগে তিনি আরেকবার দেশের নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে বলেছেন, ‘জাতির পিতার দ্বারা ঘোষিত রাষ্ট্রীয় আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে কিছুতেই সরে আসা যাবে না।’ সেদিন আমার এক কলামে তাঁকে তাঁর বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছি। আজও ধন্যবাদ জানাই। সজীব জয় বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলেও সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা বর্জন করে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠন দরকার।
সজীব জয় বয়সে তরুণ। পাশ্চাত্যে বহুদিন কাটিয়েছেন। ওয়েস্টার্ন কালচারের ভিত্তি যে ধর্মনিরপেক্ষতা, সে কথা তিনি জানেন। সে জন্যই আজ পশ্চিমা দেশগুলোর এত উন্নতি। এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলো, এমনকি মুসলিম দেশগুলো থেকেও লাখ লাখ মানুষ ছুটে যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাসের জন্য। তারা উন্নত জীবন চায়, আধুনিক জীবন চায়। লন্ডন শহর তো গির্জা আর পাবে ভর্তি। সর্বত্র মূর্তি দাঁড় করানো আছে বিশ্বের খ্যাতনামা মানুষদের। কেউ এঁদের দেবতা জ্ঞানে পূজা করে না। লন্ডন এখন মাল্টিকালচারাল সোসাইটির দেশ। মাল্টিরিলিজিয়ন দেশও। এ জন্য তারা গর্ব করে।
লন্ডনের হ্যান্ডন এলাকায় হিন্দু কমিউনিটি বিশাল মন্দির তৈরি করেছে। মুসলমানরা হ্যারোতে তৈরি করেছে বিশাল মসজিদ। লন্ডনের সেইজওয়াটার এলাকায় বৌদ্ধ কমিউনিটি তৈরি করেছে বিরাট বুদ্ধমন্দির। লন্ডনের পাড়াগুলো এ ধরনের মন্দির-মসজিদ-গির্জায় ভর্তি। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে মুসলমানদের লন্ডনে কোনো মসজিদ ছিল না, তখন তারা গির্জাগুলোতে জুমার নামাজ ও ঈদের নামাজের জামাত করত। সারা লন্ডন শহর চার্চিল, গান্ধীসহ বহু বিখ্যাত ব্যক্তির ভাস্কর্যে ভর্তি। ব্রিটিশ ক্যাপিটালিজমের শত্রু কার্ল মার্ক্সের ভাস্কর্য আছে। ভাস্কর্য আছে নেলসন ম্যান্ডেলারও। শুধু লন্ডন নয়, ইউরোপের বেশির ভাগ শহরে এই ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মহাসমন্বয়, তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান সম্প্রদায় তাদের ‘ধর্ম গেল, ধর্ম গেল’ বলে রব তোলেনি। কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শত্রু মার্ক্স, গান্ধী, ম্যান্ডেলার মূর্তি ভাঙেনি।
অথচ বাংলাদেশ, যে দেশটি হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষার মিলনে একটি আদর্শ মাল্টিকালচারাল দেশ ছিল, সে দেশটিতে জাতির পিতার ভাস্কর্য নিয়ে ‘ধর্ম গেল, ধর্ম গেল’ রব তোলা হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছে হেফাজতিদের উসকানিতে কিছু মাদরাসাছাত্র সেই ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা করে। কবি নজরুল যে ‘আমপারা পড়া হামবড়া’ মৌলবাদের কথা বলেছেন, তাদের আজ দেশে উল্লম্ফন ঘটেছে এবং ধর্মের বিধান বিকৃত করে তারা ভাস্কর্য ভাঙার ফতোয়া দিচ্ছে।
দেশের সচেতন ও আধুনিকমনা তরুণসমাজের একটা বড় অংশ যখন এই ‘আমপারা পড়া হামবড়া’দের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত, তখন দুঃসংবাদ এসেছে আবার কুষ্টিয়া থেকে। সেখানে একটি কলেজের সামনে স্থাপিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। আর এই দুষ্কার্যটি মাদরাসাছাত্ররা করেনি। করেছেন কয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও তাঁর সঙ্গীরা। তাঁরা ধর্মীয় কোনো কারণে নয়, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুবলীগ সভাপতির দ্বন্দ্বের কারণে এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছে।
কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার পরপরই কয়া ইউনিয়নের যুবলীগের নেতাদের কী করে সাহস হলো এই উপমহাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম সাহসী সেনাপতির ভাস্কর্যে হাত দিতে? এই দুষ্কৃতরা আবার কোনো মাদরাসাছাত্র নয়, এরা হয়তো কলেজের ছাত্র। সবচেয়ে বড় কথা এরা যুবলীগের স্থানীয় নেতা। আজ শহীদ শেখ ফজলুল হক মনির হাতে গড়া এবং বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদপুষ্ট যুবলীগের কী অবস্থা! দেশে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে প্রথমেই ধরা পড়েন যুবলীগের শীর্ষ কিছু নেতা। দেশে ভাস্কর্য ভাঙার অপরাধের বিরুদ্ধে আজ যখন যুবশক্তিকে জাগ্রত করার চেষ্টা চলছে, তখন এই অপরাধে যুবলীগের মফস্বলের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হওয়াও দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেতের মতো।
তাই সজীব জয়ের দিকে শুধু আমি নই, অনেকেই হয়তো আকুল আগ্রহে তাকাবেন। তিনি বয়সে তরুণ। আধুনিক উচ্চ প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত। মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা তাঁর দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করেনি। তাঁর ধমনিতে বইছে একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র গঠনের স্থপতির এবং তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার রক্তও। তিনি যথাসময়ে দেশের তরুণ প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন স্বাধীন বাংলার রাষ্ট্রীয় আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। হেফাজতিদের কাছে তিনি নতজানু হননি। দেশে হেফাজতিদের উল্লম্ফন সম্পর্কে সবাই যখন শঙ্কিত, তখন সজীব জয়ের কণ্ঠে একটি সত্য কথা সাহসের সঙ্গে উচ্চারিত হলো—হেফাজতিরা নব্য রাজাকার। অর্থাৎ অতীতের রাজাকারদের মতোই এদের রুখে দাঁড়াতে হবে।
জয়ের কথা শুনে আমার মতো অনেকের মনেই আবার আশার সঞ্চার হবে। নাহ্, দেশ সাহসী তরুণের নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে না। আর এই তরুণ নেতৃত্বের দৃষ্টি থাকবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে। অন্ধকার অতীতের দিকে নয়। আজ বাংলাদেশে মৌলবাদীদের যে হুংকার শোনা যাচ্ছে এবং মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ এই হুংকারের মুখে ক্রমশ পিছু হটছে, তখন মনে পড়ছে অবিভক্ত ভারতে অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। কংগ্রেস যদিও বলত তারা অসাম্প্রদায়িক দল, কিন্তু মদনমোহন মালব্য থেকে পণ্ডিত মতিলাল নেহরু পর্যন্ত নেতারা ছিলেন আসলে হিন্দু বর্ণবাদী নেতা। মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও তাঁরা কাজে সাম্প্রদায়িকতার পোষকতা করে চলতেন।
মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে এসে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণের পর কংগ্রেসের ধর্মান্ধতামুখী চরিত্র আরো বেড়ে যায়। গান্ধী পৌরাণিক হিন্দু যুগের আশ্রমিক রাজনীতি শুরু করেন এবং স্বাধীনতা লাভের পর ভারতে ‘রামরাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার স্লোগান দেন। এই সময় লন্ডনে উচ্চশিক্ষা লাভ এবং ব্যারিস্টার হওয়ার পর মতিলাল নেহরুর পুত্র আধুনিক যুবক এবং সোশ্যালিস্ট পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু ভারতে ফিরে আসেন। এসেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি প্রথমে পিতা মতিলাল নেহরুর পরামর্শ শুনে গান্ধী নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে কংগ্রেস রাজনীতিতে যোগ দিতে রাজি হননি। তিনি বিলাতে হ্যারল্ড লাস্কির ছাত্র ছিলেন এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজতান্ত্রিক ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। এ জন্য ভারতের তরুণ সোশ্যালিস্ট নেতারা, যেমন জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রমুখ আশা প্রকাশ করেছিলেন, জওয়াহেরলাল কংগ্রেসে যোগ না দিয়ে ভারতে সোশ্যালিস্টদের সঙ্গে যোগ দিয়ে নতুন পার্টি গঠন করবেন।
নেহরু প্রথমে গান্ধীর হিন্দু আশ্রমিক রাজনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। তিনি তাঁর এক নিবন্ধে লেখেন, গান্ধী অতীতের হিন্দু আশ্রমের সন্ন্যাসী ছাড়া আর কেউ নন। আধুনিক ভারত গড়ার তিনি কেউ নন। নেহরুর সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ভাবধারা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রদের আকৃষ্ট করে। একসময় মনে হয়েছিল, তারা জিন্নাহর বদলে তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেবে। পিতা মতিলাল নেহরুর অনুরোধে জওয়াহেরলাল কয়েকবার গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
গান্ধী হিন্দু আশ্রমিক রাজনীতি না ছাড়লেও গণতান্ত্রিক ও আধুনিক ভারত গঠনের রাজনীতির প্রতি তাঁর সমর্থনের কথা নেহরুকে জানান। জওয়াহেরলাল কংগ্রেসে যোগ দেন। গান্ধী তাঁকে ডাকতেন ‘হ্যারো বয়’। কংগ্রেস রাজনীতিতে মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা হিফজুর রহমান প্রমুখ অনেক স্বস্তি পান। ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদীরা কংগ্রেসে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে জওয়াহেরলাল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক ভারত গঠনের দিকেই নজর দিয়েছিলেন।
অতীতের এই গল্পটি বললাম এ জন্য যে জওয়াহেরলাল নেহরু কংগ্রেস রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটিয়ে দলটিকে হিন্দু বর্ণবাদীদের কবল থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন বর্তমানে পাশ্চাত্য-শিক্ষিত, আধুনিক মনের এক যুবকের সামনে সেই সুযোগ এসেছে আওয়ামী লীগকে ক্রমশ ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে মুক্ত করতে। জওয়াহেরলালের মতো বয়সেই জয়ও দেশে ফিরে এসেছেন এবং তাঁর যে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তাতে মনে হয়, তিনি আগ্রহী হলে নেহরুর মতো আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলটিকে আওয়ামী মুসলিম লীগে পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেন।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের মধ্যে তারুণ্যের ক্যারিসমা রয়েছে। এটা ২০০৮ সালেই দেখা গেছে। তিনি দেশে ফিরতেই বহু তরুণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে যোগ দেয়। বাংলাদেশের এখন বড় দুঃসময়। মৌলবাদীরা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। তাদের রাজনৈতিক শক্তি তেমন না হলেও সামাজিক শক্তি প্রচুর। আওয়ামী লীগও জাতির পিতার ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে ধর্মান্ধ রাজনীতির সঙ্গে আপস করে চলেছে।
এভাবে দেশ চললে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের যে অতুলনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটিয়েছেন, তা দুর্নীতি ও মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা নষ্ট করে দেবে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও জাতি গঠনের জন্য নিজের রক্ত দিয়ে গেছেন, তা ব্যর্থ হয়ে যাবে। সজীব জয়ের আধুনিক শিক্ষা আছে, তারুণ্যের ক্যারিসমা আছে, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতি আনুগত্য আছে। তিনিই পারেন দেশের এই দুঃসময়ে তরুণ শক্তির বিভ্রান্তি ঘুচিয়ে তাদের আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। আওয়ামী লীগকে ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের কবল থেকে মুক্ত করতে। পারেন তাঁর মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে শক্তি জোগাতে। সজীব জয় কি হবেন আধুনিক বাংলা গড়ার আধুনিক জওয়াহেরলাল? প্রশ্নটি সুদূর বিদেশে বসে তাঁর কাছে রাখছি।





সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ





ebarta24.com © All rights reserved. 2021