শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন

পার পাবে না অপপ্রচারকারী : এক হাজার আইডি চিহ্নিত, গ্রেপ্তার ৪৪

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২০
পার পাবে না অপপ্রচারকারী

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারকারী ব্যক্তিদের বিদেশ যেতে ও বিদেশ থেকে আসার পথ বন্ধ। তারা বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যেতে চাইলে এবং বিদেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসতে গেলে বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার হবেন। এরই মধ্যে ১ হাজার আইডি চিহ্নিত করে নাম, ছবিসহ বিমানবন্দরে তালিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ গণতান্ত্রিক পুলিশিং ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। তাই অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে। মিথ্যাচার তথা প্রপাগান্ডা সাংবিধানিকভাবে ও প্রচলিত আইনে একটি অপরাধ। তাই যারাই অনলাইনে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়াবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব বিষয় নিয়ে আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কাজও শুরু করেছি।

এদিকে দেশের বাইরে থাকা কিছু প্রবাসী প্রতিনিয়ত দেশের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছে। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। আবার কেউ সাজাপ্রাপ্ত আসামিও। কর্নেল (অব) শহিদ নামের এক ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত আসামি। এছাড়া সাংবাদিক কনক সারোয়ার, ইলিয়াস হোসেন, দেলোয়ার, শিবির নেতা নওশিন মুস্তারি মিয়া সাহেব, সায়েম আহমেদ, মোহাম্মদ মাসুদুল হাসান, আলামিন, বিএনপি নেতা শরিফ রানা, জুবায়ের আহমদ, আবু জাফর, জাকারিয়া, আবদুস সালাম, সাংবাদিক পিনাকি ভট্টাচার্য অন্যতম। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোদ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিদেশে বসে প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি নানা ধরনের গুজব সৃষ্টি করে আসছে। এসব ব্যক্তি দেশে আসা মাত্রই বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার হবেন এমনটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা যায়, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ আইডিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনাও নেওয়া হয়েছে। দেশে থেকে যারা এ ধরনের গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত তারা দেশ থেকে যেন পালাতে না পারে সেজন্য আদালতের নির্দেশনা নেওয়া হয়েছে। এমনকি গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যেও রাখা হয়েছে।

সূত্র মতে, বর্তমানে দেশের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুককে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এক শ্রেণির ব্যক্তি। বিশেষ করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনগণের মাঝে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করছে। এটি বর্তমান চলমানও রয়েছে।

সম্প্রতি ফ্রান্সে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) ও ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি করায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

এছাড়া ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশই ছিল গুজবনির্ভর।

গুজব ছড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গরুবাহী কাভার্ড ভ্যান চুরি সন্দেহে পুলিশের উপস্থিতিতে এক যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলে জনতা। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল এ ঘটনা ঘটে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের জাগীর ইউনিয়নে আকিজ টেক্সটাইলের কারখানায় চার সহকর্মী কম্প্রেসার যন্ত্র দিয়ে পায়ুপথে বাতাস দিয়ে নির্যাতন করে জুলহাস নামের এক কর্মীকে হত্যা করে।

চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগে শাহীন হোসেন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মসজিদের মাইকে ডাকাত ঘোষণা দিয়ে ২৫ এপ্রিল নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে তুচ্ছ ঘটনার জেরে সুমন নামের এক তরুণকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এমন অনেক নির্মম ঘটনার সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রাতে যোগ হয়েছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ঘটে যাওয়া জুয়েল হত্যাকাণ্ড। ধর্ম অবমাননার গুজব রটিয়ে আবু ইউনুছ মো. গাহিদুন্নবী জুয়েল নামের ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর তার লাশও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বীভৎস বর্বরতার ঘটনায় হতবাক দেশবাসী।

কখনো সন্দেহ, কখনো ছোট অপরাধ, কখনো বিপদ-শঙ্কার, গুজব, আবার কখনো তুচ্ছ কারণে বিরোধ-প্রতিহিংসায় মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনো পরিকল্পিতভাবে দলবদ্ধ মানুষ আবার কখনো বিচ্ছিন্ন থেকেও অনেকে হয়ে উঠছে নির্দয় খুনি। গণপিটুনির নামে নির্যাতনে হত্যার ঘটনা বাড়ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত ১০ বছরে গণপিটুনির নামে হত্যা করা হয়েছে ৮৯৫ জনকে। গত বছর গুজবে বেড়েছে এমন নৃশংস ঘটনা।

চলতি বছরের করোনাকালে অঘোষিত লকডাউনের কারণে কমে গেলেও সম্প্রতি বাড়তে শুরু করেছে এমন নির্মম ঘটনা। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা অনুযায়ী কাউকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলাও খুন হিসেবে গণ্য হবে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের আলোচিত গণপিটুনির ঘটনাও তদন্তপূর্বক বিচার হয়নি। বেশিরভাগ ঘটনায় সাক্ষী পাওয়া যায় না বলে পুলিশ ‘খুনি’ শনাক্ত না করেই আদালতে প্রতিবেদন দিচ্ছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৩০। এর মধ্যে খুলনায় ১০ জন, ঢাকায় ৯ জন, রাজশাহীতে তিন, রংপুরে এক, চট্টগ্রামে পাঁচ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুজন নিহত হয়েছে।

২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫। এর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৫ জন এবং ঢাকায় খুন করা হয় ২৪ জনকে। ২০১৮ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল ৩৯ জন।

এর মধ্যে ঢাকাতেই নিহত হয় সর্বোচ্চ ২১ জন। এর আগে ২০১৭ সালে ৫০ জন, ২০১৬ সালে ৫১ জন, ২০১৫ সালে ১৩৫ জন এবং ২০১৪ সালে ১১৬ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বরাত দিয়ে আসকের আরেকটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে ৮০০ জন। এই হিসাবে ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত (সেপ্টেম্বর) এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮৯৫ জন। প্রায়ই সামান্য কারণে বা অপরাধের অভিযোগ তুলে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া যায়। গত ১১ সেপ্টেম্বর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় গরুচোর সন্দেহে এলাকাবাসী পিটিয়ে কাজী উজ্জ্বল হোসেন নামের এক যুবককে মেরেই ফেলে।

ছেলেধরা গুজব সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ার কারণে গণপিটুনির কবল থেকে রেহাই পায়নি সাধারণ পথচারী, নিরপরাধ ব্যক্তি, মানসিক প্রতিবন্ধী, ভবঘুরে নারীও।

পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে, এমন গুজবে জুলাইয়েই পিটিয়ে মারা হয় ১৭ জনকে। ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানের ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তাছলিমা রেনু নামের এক নারী। এই ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়েছিল।

সম্প্রতি গত ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটে মসজিদে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহ আগুনে পোড়ানোর ঘটনা ঘটে। যদিও পরবর্তীতে স্থানীয়রা বলেন নিহত ব্যক্তি ধার্মিক ছিলেন।

এর আগে বেশ কয়েকবার কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ রোববার বিকেলে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে কুমিল্লার মুরাদনগরে সাতটি ঘরে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ অভিযোগে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা এর আগেও হয়েছে। তাই আর যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সে লক্ষ্যে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, র্যাবের একটি দক্ষ ও চৌকস সাইবার মনিটরিং টিম রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক সব সামাজিক মাধ্যম নজরদারি করছে। যদি কেউ গুজব সৃষ্টির চেষ্টা করে তাকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা বলেন, গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। পাশাপাশি জনগণকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে।


আরও সংবাদ