1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা - ebarta24.com
  1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা - ebarta24.com
সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা

মোহাম্মদ শাহজাহান
  • সর্বশেষ আপডেট : শনিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২১

যুবনেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ৮৩ তম জন্মদিন ৪ ডিসেম্বর। তার মতো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী যুবনেতা তার সমসাময়িকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ভার। তার ছিল আকাশচুম্বী গ্রহণযোগ্যতা। তার ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে হওয়ার পাশাপাশি শেখ ফজলুল হক মনির মধ্যে এমন কিছু মানবীয় গুণ ছিল, যা সচরাচর দেখা যায় না। শেখ মনি ১৯৭০-এর নির্বাচন কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা ছিলেন। তখন তার বয়স ত্রিশের কোঠায়। তিনি আইয়ুব খানের পান্ডা গভর্নর মোনেম খানের কাছ থেকে সনদ নিতে অস্বীকার করেন। যে কারণে তার এমএ ডিগ্রি পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়।

১৫ আগস্ট যদি শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যা করা না হতো, তাহলে হয়ত বাংলাদেশের রাজনীতি অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। ধারণা করা যায়, এ জন্যই খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেখ ফজলুল হক মনিকেও হত্যা করে। দেশ-বিদেশের খুনিরা একথা নিশ্চিতভাবেই জানত যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে হলে মুজিবের সঙ্গে মনিকেও হত্যা করতে হবে।

রাজনীতির ময়দানে শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন অলরাউন্ডার। তার এতসব গুণ ছিল, যা এক কলামে লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন সাহসী-তেজস্বী, দক্ষ সংগঠক, সুবক্তা, লেখক ও অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। ভাগ্নে বলে নয়, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বমানের নেতাকে মনি অতি অল্প বয়সেই জয় করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুজিব বাহিনীর ৪ জনের অন্যতম শীর্ষ অধিনায়ক ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির হাত দিয়েই গড়ে ওঠে যুবলীগ। যে দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। আর ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও স্বাধিকার আন্দোলনের নক্ষত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের সৃজনশীল যুবনেতা ও মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তথা মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৩৯-এর ৪ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তার বাবা শেখ নূরুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি। মা শেখ আছিয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর বড় বোন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ষাটের দশকে সামরিক-শাসনবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে তিনি সাহসী নেতৃত্ব দেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ৬ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৪-এর এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে সমাবর্তন বর্জন আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও ১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন এবং দেড় বছর কারাভোগ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ও কৃতিত্ব ছিল- ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফার পক্ষে হরতাল সফল করে তোলা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ’। তিনি সংগঠনটির দায়িত্ব দেন শেখ ফজলুল হক মনিকে। কংগ্রেসে শেখ মনিই যুবলীগের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

শেখ ফজলুল হক মনি তেজগাঁও আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের সভাপতি হয়ে শ্রমিকদেরও সংগঠিত করেন। শেখ মুজিবসহ অন্য নেতাদের গ্রেপ্তার ও পূর্ব বাংলায় নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ আহূত হরতালে শেখ মনি, আবদুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকীসহ ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

সব দলমতের লোক নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিবাহিনী। আর পাশাপাশি গঠন করা হয় মুজিব বাহিনী (বিএলএফ বা বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট)। মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে বেছে বেছে মুজিব বাহিনী নামে রাজনৈতিক গেরিলা বাহিনীটি গঠন করা হয়। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মুজিব বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন জেনারেল উবান।

আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতা ফকীর আবদুর রাজ্জাক শুরু থেকেই মনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ থাকার পাশাপাশি যুবলীগ ও বাংলার বাণী প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ফকীর আবদুর রজ্জাকের লেখা ‘শেখ ফজলুল হক মনি- অনন্য রাজনীতির প্রতিকৃতি’ নামের ৬৪ পৃষ্ঠার একটি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ ২০১০ সালে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে মনি মুজিব বাহিনী যেমন গড়ে তুলেছিলেন, একই সঙ্গে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক বাংলার বাণী বের করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজেও লেখালেখি করেছেন। ফকীর রাজ্জাকের গ্রন্থে উঠে এসেছে একাত্তরে ভারত সরকার এবং সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও ৩২ বছরের শেখ ফজলুল হক মনিকে সেই একাত্তরেই বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সম্মান দিয়েছেন।

যুদ্ধের শেষদিকে অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে শেখ মনি মেঘালয় থেকে একটি বিশেষ বিমানে দিল্লি যান। বিশেষ প্রটোকল দিয়ে তাকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসা ছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ মনি দেখা করে প্রয়োজনীয় কথা বলে বের হয়ে এসে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জানা যায়, সেদিন শেখ মনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বেশ জোরালো ভাষায় বলেছিলেন- “বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি করার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি সবকিছুর উপরে রাখতে হবে।” দুদেশের মধ্যে ২৫ বছরের মৈত্রীচুক্তি হবে- এ কথা শুনেই তিনি সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন শেখ ফজলুল হক মনি। দেশ মুক্ত হওয়ার ২ মাস ৫ দিনের মাথায় শেখ মনির সম্পাদনায় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ দৈনিক বাংলার বাণী প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যাটি বঙ্গবন্ধুকে দেয়ার সময় দুই নেতার (মামা-ভাগ্নে) ছবিটি এখনো স্মৃতি হয়েই রয়েছে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মাত্র দুই মাসে একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করা এককথায় দুরূহ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ১১ মাসের কম সময়ের মধ্যে ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর শেখ মনি আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে যুবলীগ গঠনের কনভেনশনে শেখ ফজলুল হক মনি সভাপতিত্ব করেন। এতে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার যুবকর্মী সেদিন সেখানে এসেছিল। আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় শেখ মনিকে। দুদিন পরেই ১১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। কিছুদিনের মধ্যে প্রথমে ২১ ও পরে ৩৫ সদস্যের কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

যুবলীগ গঠনের কনভেনশনে দেড় ঘণ্টার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে শেখ মনি নতুন দেশের অর্থনীতি-কৃষিনীতি ও শিল্পনীতি বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশের অনুকরণে তিনি যুবলীগের সম্মেলনকে কংগ্রেস, সভাপতির পরিবর্তে চেয়ারম্যান ও সহসভাপতির পরিবর্তে প্রেসিডিয়াম নামকরণ করেন। কথা ছিল মনি কমিটি গঠন করে বঙ্গবন্ধুকে দেখাবেন। ফকীর রাজ্জাক তার গ্রন্থে লিখেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই কার্যকরী কমিটির একটি খসড়া তালিকা তৈরি করে ঘনিষ্ঠ কজনকে দেখান।

১৯৭৩ সালেই শেখ মনি দৈনিক ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও দৈনিক সংবাদের আহমেদুল কবিরের সঙ্গে যৌথভাবে জার্মান থেকে গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন আমদানি করে ৮১ মতিঝিল থেকে নতুনভাবে বাংলার বাণী পত্রিকা ছাপার ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৩ সালে শেখ মনি বের করেন চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক ‘সিনেমা’। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে শেখ মনি সাপ্তাহিক (পরে দৈনিক) পিপলস- এর বার্তা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৪ সালে বের করেন ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস।

বাকশাল গঠনের কয়েক মাস আগে হঠাৎ একদিন পত্রিকায় বিবৃতি দেন। বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৫ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান হন বঙ্গবন্ধু এবং এর ৩ জন সেক্রেটারি ছিলেন- জিল্লুর রহমান, শেখ মনি ও আবদুর রাজ্জাক। জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় যুবলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগ- এই চারটি অঙ্গ সংগঠন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু আসলে গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগের চেয়ারম্যান ছাড়া আর কোনো পদে ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার কী পরিমাণ প্রভাব ছিল এমন একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে- বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বাকশাল ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন না। তিনি একথা বঙ্গবন্ধুর কাছে জানানোর জন্য বাকশাল প্রতিষ্ঠার আগের রাত ২৪ জানুয়ারি ৩২ নম্বরে যান। বাসায় গিয়ে দেখেন সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করছেন।

ড. ওয়াজেদ তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন- “বৈঠকখানার বাইরে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। এর পরেও তারা যাচ্ছেন না লক্ষ্য করে আমি স্থির করলাম যে, রাতে খাবারের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো। ঐ সময় বঙ্গবন্ধু দুই নেতাকে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাসার বাইরে যান। রাত ১০টার দিকে বাসায় ফেরেন। এগারোটার দিকে হাসিনা ও আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খেতে বসি।সে সময় বঙ্গবন্ধু কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে খাবার শেষ করে অতিদ্রুত তার শয়নকক্ষে চলে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষের দরজা ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করে, বিশেষ করে আমার শাশুড়িকে শয়নকক্ষের বাইরে রেখে শেখ মনিকে ইতিপূর্বে কখনো তার (বঙ্গবন্ধুর) সঙ্গে আলাপ করতে দেখিনি। রাত প্রায় পৌনে একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ততক্ষণেও শেখ মনির বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষ হলো না। অতঃপর আমরা বাসায় চলে যাই রাত ১টার দিকে।” (পৃ. ২১৫)

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ওইদিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মনি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে মনি প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

বক্তৃতার পর সৈয়দ আহমদ একজন যুবককে যুবলীগ নেতা ফকীর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বলেন- “এ ছেলেটি আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং এখন পুলিশে গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করে।” আগন্তুক ছেলেটি একান্তে গিয়ে সৈয়দ আহমদ ও ফকীর রাজ্জাক প্রমুখকে জানায়, চাকরিসূত্রে সে সেনাসদর এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। ছেলেটি বলল- “পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশে যে কোনো সময় বড় ধরনের খারাপ কিছু ঘটে যাবে। এমনকি আজ রাতেই সরকারের পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। সাবেক ও সদ্য চাকরিচ্যুত ও চাকরিরত বেশকিছু সেনা কর্মকর্তা সেনানিবাসে গোপনে শলাপরামর্শ করছে। ওদের হাবভাব ভালো নয়। কানাঘুষা চলছে। দেশে বড় একটা কিছু হয়ে যাবে।”

বক্তৃতা শেষে শেখ মনি তার গাড়ির কাছে গেলেন; সৈয়দ আহমদ, সুলতান শরীফ, শফিকুল আজিজ মুকুল ও ফকীর রাজ্জাক বললেন, জরুরি কথা আছে। শেখ মনি তাদেরকে গাড়িতে উঠতে বলেন। মনির গাড়িতে ওঠেন সৈয়দ আহমদ। বাকিরা সুলতান শরীফের গাড়িতে ওঠে। রাত সাড়ে ৯টায় তারা গেলেন ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে এসে মনি জানান- “মামাকে সব কিছু জানিয়েছি, তিনি এখনই খোঁজ নিবেন।” তারা চলে এলেন মনির ধানমণ্ডির ১৩ নম্বর সড়কের ভাড়া বাড়িতে।

এই মহান নেতার জীবন প্রদীপ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিভে গেল। ১৫ আগস্ট জাতির পিতার সঙ্গে যদি শেখ মনি নিহত না হতেন, তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মুজিব হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী জিয়া-এরশাদরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করতে পারত না। আজ ব্যথিত হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মনি ভাইকে!

লেখক: মোহাম্মদ শাহজাহান, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।





সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ





ebarta24.com © All rights reserved. 2021