[…]২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও মমতাময়ী শেখ হাসিনা: ক্যাপ্টেন সামস

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও মমতাময়ী শেখ হাসিনা: ক্যাপ্টেন সামস

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অক্টোবর ১২, ২০১৮ , ৩:২৫ অপরাহ্ন
বিভাগ: ফিচার

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও মমতাময়ী শেখ হাসিনা: ক্যাপ্টেন সামস

✣ তারেক রহমান প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদেরও ভৃত্য জ্ঞান করতেন। অথচ সজীব ওয়াজেদ একজন সৈনিকের সাথেও কথা বলেন আন্তরিকতার সাথে।

✣ বলা হয়, তারেকের মতো নিষ্ঠুর, বর্বর, উগ্র মেজাজী ও প্রতিহিংসা পরায়ন মানুষ খুব কম জন্মগ্রহণ করে।

একুশে অগাস্টের হামলাস্থল থেকে উদ্ধার করা অবিস্ফোরিত গ্রেনেড আলামত হিসেবে রাখতে চাওয়ায় সেনাবাহিনীর তৎকালীন বোম্ব ডিসপোজেবল কোম্পানির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন সামসুদ্দীন আহমদ সামসকে পাঠানো হয়েছিল অকালীন অবসরে। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর আলামত গোপনের অভিযোগ তখনই তুলেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। পরে তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দও বলেন, আলামত নষ্ট করে ফেলায় তার কাজ কঠিন হয়ে উঠেছিল। দেশের জাতির পিতার কন্যা ও প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা সভ্য কোনো দেশে হতে পারে তা কল্পনারও অতীত। সকল কল্পনাকে হার মানানো ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কিছুদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহের প্রধানরা জানতে পারেন এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কে বা কারা ছিল। ফলে বিএনপির পক্ষ থেকে একে একে সরে দাঁড়ায় সকল আন্তর্জাতিক মহল।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনাশ করতে যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল, তা বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়েও উঠে এসেছে। এখনো রাষ্ট্রের পরিচালকদের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তার সাক্ষী রয়েছেন অনেকে।

“আমি তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে একটা কোম্পানিতে ছিলাম।
তখন দায়িত্বশীল সকল সরকারী কর্মকর্তাদের মাঝে তারেকভীতি কাজ করতো। নিরাপত্তা প্রহরী থেকে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা সচিব যাকে যখন ইচ্ছা ডেকে পাঠাতেন তারেক রহমান। এমনো হয়েছে যে একজন সচিবকে ডেকে আড়াই ঘন্টা অপেক্ষা করানো হয়েছে। তারপর সাক্ষাতে খুব সামান্য কোনো নির্দেশ দিয়েছেন যা ফোনে বললেই হত। সবচেয়ে বিব্রতকর ছিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রতি তারেক রহমানকে স্যার ডাকার অলিখিত নির্দেশ। খুব সামান্য ঘটনায় উগ্র মেজাজী তারেকের অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রশাসনে মারাত্বক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তারেক রহমানের সংস্পর্শে থাকা দায়িত্বপালনকারীদের ভাষ্য ছিল, তারেকের মতো নিষ্ঠুর, বর্বর, উগ্র মেজাজী ও প্রতিহিংসা পরায়ন মানুষ খুব কম জন্মগ্রহণ করে।

অথচ গত দশ বছরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে সরকারী দলের কথা শুনলে বিস্ময় এবং প্রত্যাশা দুটোই জাগে। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে আলোচনা হয় যে, তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন সাধারণ সৈনিক বা কনস্টেবেলের সাথেও তিনি হাসিমুখে আন্তরিকতার সাথে কথা বলেন। আমার কলিগরাই বলেন, সজীব ওয়াজেদ অন্যায় আদেশ দূরের কথা কোনো নেতা বা প্রশাসনের পদস্থদের সাধারণ বিষয়ের ক্ষেত্রেও কখনো নির্দেশের সুরে কথা বলেন নি। তারেক রহমান কি ধরণের বিভীষিকা তা এখনকার অনেকেরই অজানা।

২০০৪ সালে আমার কোম্পানিটা মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বোম্ব ডিসপোজাল কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল। সেটা একটা ব্রিগেডের আন্ডারে ছিল। ব্রিগেডের তিনটা ব্যাটালিয়ন ছিল, একটা স্বতন্ত্র কোম্পানি ছিল। আমি সেই কোম্পানির অধিনায়ক ছিলাম।

শেষ বিকালে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর রাতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন সামস, তার কোম্পানির সদস্যদের নিয়ে।

রাত সোয়া ১০টার দিকে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালাম। দূর থেকে দেখানো হল দুইটা গ্রেনেড আছে। কিন্তু সেখানে আলামত সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা দেখিনি। পুলিশের ঊর্ধতন কোনো কর্মকর্তা সেখানে ছিল না। একজন কনস্টেবলকে সেখানে দেখতে পেয়েছিলাম।

ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর প্রতিনিয়ত কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ রাখছিলাম। আমাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যেন সাংবাদিকদের বেশি কিছু না বলি।

ওই রাতে দুইটা আর্জেস গ্রেনেড পেয়েছিলাম। সেগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিসম্পন্ন। একেকটি গ্রেনেডে চার হাজার স্প্লিন্টার ছিল। যদি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে একটি স্প্লিন্টারও কাউকে আঘাত করে, তাহলে সেই ব্যক্তিরও মৃত্যু হতে পারে।

সেদিন ডজন খানেক গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হন আওয়ামী লীগের ২৪ নেতা-কর্মী। আহত কয়েকশ জনের অনেকে এখনও স্প্লিন্টার দেহে নিয়ে বেঁচে আছেন।

আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে পাওয়া দুটি আর্জেস গ্রেনেড ওই রাতেই ধ্বংস করা হয়েছিল। পরদিন আরও দুটি আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধারের পর সেগুলো সেনানিবাসে এনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারাও সেগুলো দেখেন।

আলামত হিসেবে ওই দুটি গ্রেনেড রাখতে চাইলেও নিরুৎসাহিত করা হয় ও পরে সেগুলো ধ্বংস করা হয়।

ওইদিন সর্বোচ্চ স্থানের নির্দেশে রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে এমন একটা আলামত না রাখার পক্ষে দাঁড়িয়ে গেল, এই কাজটা তো মোটেই ভালো কোনো কাজ হল না। এখন এসব বুঝতে পারছি। তখন সরল বিশ্বাসে বলেছিলাম, আলামত রাখতে চাই। তখন বুঝতে পারিনি, কেউ সেগুলো রাখতে চাইছে না।”

কেন, কী দরকার এসব আলামত রাখার, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছিল। কিন্তু নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে পেশাগত দায়িত্ব থেকে আলামত রাখার কথা বলেছিলাম। কিন্তু ওরা চাচ্ছিল, আমিও যেন বলি, আলামত রাখাটা ঠিক হবে না। কিন্তু আমি সত্য উদঘাটন করতে চেয়েছিলাম।

গ্রেনেড হামলার ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে প্রথমে বদলি করে পাঠানো হয় নাটোরে। সেখানেও গোয়েন্দা নজরদারি চলতে থাকে। জানুয়ারি মাসে তাকে পাঠানো হয় অকালীন অবসরে।

আমার মেজর হওয়াটা তখন অনেকটাই নিশ্চিত ছিল, কিন্তু তা আর হয়নি। তার আগেই অকালীন অবসরে যেতে হয়েছে।

মাঝেমাঝে মনে হয় বর্তমানে যারা সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী, তাদের সৌভাগ্য যে শেখ হাসিনার মত একজন মমতাময়ীকে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছেন। ১৯৯৮ সালের কথা। শেখ হাসিনা সেনানিবাসে গিয়ে দেখলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা একবেলা ভাত পান এবং সেই মোটা ভাতের চাল অত্যন্ত নিম্নমানের। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি নির্দেশ দিলেন, সেনাসদস্যদের জন্য দুবেলা উন্নতমানের চিকন চালের ভাতের ব্যবস্থা করতে হবে। এও বললেন সেই ব্যবস্থা হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিও ভাত খাবেন না। বর্তমানে কর্মরত অনেকেও সম্ভবত এটি জানেন না।

একটা বিষয় আমি ঠিক বুঝতে পারি যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাবাহিনীর মধ্যে কারো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে, কিন্তু শেখ হাসিনা প্রশ্নে তাদের একাত্মতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে তারা পরিবারের সদস্যের মত ভালোবাসেন। প্রত্যেকে এটা বিশ্বাস করেন যে, সরকারী চাকুরীজীবিদের জন্য সৎভাবে চলার মত ব্যবস্থা শেখ হাসিনা করে দিয়েছেন যে কারণে দুর্নীতি হ্রাস পেয়েছে, অগ্রগতি হচ্ছে দেশের। ২০১৮ সালে সরকার অনেক শক্ত অবস্থানে আছে। কিন্তু ২০১৪ সালে বিরোধী দলগুলোর আহুত আন্দোলনে যে ভয়াবহ তাণ্ডব চলেছিল এবং যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আক্রমণের টার্গেট করা হয়েছিল তাতে সমূহ সম্ভাবনা ছিল যে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জীবনের মায়া ত্যাগ করে তারা যেভাবে নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তি পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে তা সরকারের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শন। এটির অভাব ছিল বলেই ৯০, ৯৬ ও ২০০৭ এ ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়েছিল। আর মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর মমত্ব ও ভালোবাসার কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার গত দশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হয়েছে এবং নিশ্চিতভাবে আগামী মেয়াদেও ক্ষমতায় থাকবে।

আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা দল বড় কথা নয়, কিন্তু দলের নেতৃত্বের মানসিকতা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বর্বর ও প্রতিহিংসাপরায়ন কাউকে কোনো দেশের মানুষ সমর্থন করতে পারে না। তাই আক্রমণই করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা সকলের কাছে পরিত্যাজ্য। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়।

আমি মনে করি ভালো ২১শে আগস্টের রায় হয়েছে, সুন্দর রায় হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, সত্য উদঘাটন হয়েছে। আমরা চাই, যেই ক্ষমতায় থাকুক এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। দেশটার ক্ষমতায় যারাই থাকুক না কেন সবার মধ্যে যেন সহমর্মিতা কাজ করে।”



নির্বাচন বার্তা