[…]রোজ গার্ডেন : আওয়ামী লীগের জন্ম যেখানে

রোজ গার্ডেন : আওয়ামী লীগের জন্ম যেখানে

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অক্টোবর ৩১, ২০১৮ , ৯:০৯ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। এদিন এক গোলাপ বাগানে জন্ম হয় বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।

দেশ ভাগ হয়েছে তখন মাত্র দুবছর। যে মুসলিম লীগের কারণে পাকিস্তানের জন্ম, সেই মুসলিম লীগের একাংশ পূর্ববাংলার প্রাদেশিক নেতাকর্মীরা দলের ওপর আর আস্থা-ভরসা রাখতে পারছেন না। পুরান ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেনে বাস করতেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শওকত আলী। তিনি বাংলাভাষা আন্দোলনের একজন অন্যতম নেতা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পেছনে তার ভূমিকা ব্যাপক।

শওকত আলীর ১৫০ নং মোগলটুলির বাসভবন ছিল তখন পূর্ববাংলার রাজনৈতিক কর্মীদের অফিস। কয়েক মাস ধরে তিনি এ সম্মেলনের জন্য তৎপর ছিলেন। তার অনুরোধেই কলকাতা থেকে আসেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন আসামের ধুবড়ী জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকায় এসেছেন। তার সঙ্গে শওকত আলীর আলোচনা হয়। শওকত আলী মওলানা ভাসানীকে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার কথা জানান। এ সময় মওলানা ভাসানী অবস্থান করছিলেন আলী আমজাদ খানের বাসায়। শওকত আলীর সঙ্গে তার প্রাথমিক আলোচনা সেখানেই। এই আলোচনার সূত্র ধরে নতুন দল গঠনের জন্য একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শওকত আলী। শওকত আলী এ পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের নেতাদের নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন।

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন নতুন দল গঠনের লক্ষ্যে এক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় রোজ গার্ডেনে। ২৩ জুন বিকাল ৩টায় সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শওকত আলী, আনোয়ারা খাতুন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, আবদুল জব্বার খদ্দর, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আতাউর রহমান খান, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, আলী আমজাদ খান, শামসুদ্দীন আহমদ (কুষ্টিয়া), ইয়ার মোহাম্মদ খান, মওলানা শামসুল হক, মওলানা এয়াকুব শরীফ, আবদুর রশিদ প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে।

প্রতিষ্ঠাকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান।

দল গঠন প্রসঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তার জবানিতে বলা হয়েছে, “সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন। তার নাম দেওয়া হল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। কারাগারের যন্ত্রণা কি এইবারই বুঝতে পারলাম।”

এতকিছু হচ্ছে অথচ তিনি নেই, আবার তিনি আছেনও। তার মন তখন ছটফট করছে জেলখানা থেকে বেরোনোর জন্য। কয়েকদিন পরই তিনি মুক্তি পেলেন। স্বয়ং ভাসানী গেছেন তাকে অভিনন্দন জানাতে। আরো কয়েক বছর পর জেলখানায় বসেই বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখছেন, “আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হওয়ার কয়েকদিন পরেই আমার ও বাহাউদ্দিনের মুক্তির আদেশ এলো। বাইরে থেকে আমার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই খবর পেয়েছিল। জেলগেটে গিয়ে দেখি বিরাট জনতা আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য এসেছে মওলানা ভাসানী সাহেবের নেতৃত্বে। বাহাউদ্দিন আমাকে চুপি চুপি বলে, ‘মুজিব ভাই, পূর্বে মুক্তি পেলে একটা মালাও কেউ দিত না, আপনার সাথে মুক্তি পাচ্ছি, একটা মালা তো পাব!’ আমি হেসে দিয়ে বললাম, ‘আর কেউ না দিলে তোমাকে আমি মালা পরিয়ে দিতাম।’ জেলগেট থেকে বের হয়ে দেখি, আমার আব্বাও উপস্থিত। তিনি আমাকে দেখবার জন্য বাড়ি থেকে এসেছেন। আমি আব্বাকে সালাম করে ভাসানী সাহেবের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁকেও সালাম করলাম। সাথে সাথে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি উঠল। জেলগেটে এই প্রথম ‘আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ’ হলো। শামসুল হক সাহেবকে কাছে পেয়ে তাকে অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম, ‘হক সাহেব, আপনার জয়, আজ জনগণের জয়।’ হক সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, ‘চল, এবার শুরু করা যাক’।”

সেই যে পদযাত্রা শুরু হলো, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন করে ছাড়লেন। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এর মধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।

২৪ বছরের পাকিস্তান শাসনামলে আওয়ামী মুসলিম লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দুই বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল।

১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নতুন নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। এর কারণ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিয়ে দলটি সর্বজনীন, সর্বসাধারণের অংশ হতে চেয়েছিল।



ফিচার

অপরাধ বার্তা