[…]নাইকো দুর্নীতির অর্থ: কার কাছে কত গেলো

নাইকো দুর্নীতির অর্থ: কার কাছে কত গেলো

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:নভেম্বর ২৫, ২০১৮ , ৯:০১ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

গ্যাসক্ষেত্রের চুক্তি আদায় করে নিতে নাইকো বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে অর্থ বণ্টন নিয়ে সমঝোতা করেছিল। সেগুলোর কয়েকটি বাস্তবায়িত হয়েছে। আর কয়েকটি হয়নি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি অর্থ দেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে গ্রহীতার পরিচয় গোপন রাখতে অন্য কারও ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কাশেম শরিফ একটি চুক্তির আওতায় শুধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে অর্থ দেওয়ার দাবি করলেও ‘রয়াল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ’ (আরসিএমপি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের’ (এফবিআইয়ের) তদন্তকারীদের যেসব প্রতিবেদন বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে, সেগুলো থেকে দেখা গেছে, কাশেম শরিফ তার নিজের হিসাব থেকে যেমন অর্থ দিয়েছেন, তেমনি নাইকো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তার প্রতিষ্ঠান স্ট্রাটামের ব্যাংক হিসেবে জমা হওয়া অর্থও গেছে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসেবে। এসব ব্যক্তি গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ অন্যদের পক্ষে অর্থ নিয়েছেন। আর মামুন দুর্নীতির অর্থ নিয়েছেন তারেক রহমানের সুবিধার জন্য। নাইকোর অর্থ জমা হওয়া তার একটি ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে মামুন ও তারেক রহমানের ক্রেডিট কার্ড যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা। তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে কাশেম একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদের স্ত্রীর নামে যুক্তরাষ্ট্রে কেনা হয়েছিল বাড়ি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবৈধ সুবিধা দিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কানাডার আদালত নাইকো কানাডাকে প্রায় ৯৫ লাখ ডলার জরিমানা করে।

নাইকো কানাডার প্রতিষ্ঠা চেয়ারম্যান রবার্ট ওলসন। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় থাকা হোল্ডিং কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস কেম্যান। আর তা নাইকো বাংলাদেশের মালিক। নাইকো কানাডার অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ পাঠানো হতো বারবাডোজে নিবন্ধিত নাইকো বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে। তারপর সেখান থেকে অর্থ আসত নাইকো বাংলাদেশের বাংলাদেশ অফিসে। বারবাডোজকে করস্বর্গ হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

নাইকোর ওলসন স্ট্রাটামের কাশেম শরিফকে নাইকো বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য নিযুক্ত করেন। কাশেম নাইকো বাংলাদেশের দায়িত্ব নিলে নাইকো বাংলাদেশের এজেন্ট হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয় তার প্রতিষ্ঠান স্ট্রাটাম। স্ট্রাটাম তার নিজের প্রতিষ্ঠান হলেও কাশেম শরিফ নাইকো বাংলাদেশের পক্ষে এবং স্ট্রাটামের পক্ষে আসিফ আজিজ রহমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৯ সালে হওয়া ওই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি সম্পাদনের ১৫ দিনের মধ্যে স্ট্রাটামকে ৪০ লাখ ডলার দিয়ে দেওয়া হবে। নাইকো বাংলাদেশের এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরুর পর থেকে স্ট্রাটাম ব্যয় নির্বাহের জন্য মাসিক ৪০ হাজার ডলার করে পেত। ২০০৩ সালে এই অর্থের পরিমাণ কমে হয় ২০ হাজার ডলার। পরবর্তী সময়ে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি সম্পাদিত হয়ে গেলে নাইকো বাংলাদেশ স্ট্রাটামকে গ্যাস প্রকল্পের ১০ শতাংশ শেয়ার দিয়ে দেয়।

নাইকো দুর্নীতি সম্পর্কে আর্থিক লেনেদেনের প্রথম যে উদাহরণটি আরসিএমপি ও এফবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা কাশেম–শরফুদ্দিনের। ফাইভ ফেদার্স নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শরফুদ্দিন আহমেদের কাছে কাশেম শরিফের প্রত্যাশা ছিল, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ঘুষ দিয়ে নাইকোকে তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রের প্রকল্প পাইয়ে দেবেন। ১৯৯৯ সালে সংশ্লিষ্ট তিনটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনেরর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে বাপেক্স ও নাইকো বাংলাদেশের মধ্যে ‘ফ্রেমওয়ার্ক অব আন্ডার্স্ট্যান্ডিং’ (এফওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর চেয়ে বেশি প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় শরফুদ্দিনকে অব্যাহতি দেন কাশেম।

শরফুদ্দিন এক লাখ ১৬ হাজার ডলার দাবি করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মাত্র ৩৫ হাজার ডলার দেওয়া হয়, যার মধ্যে তার যাওয়া-আসার খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই অর্থ তাকে কাশেম শরিফ নিজের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে দিয়েছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর শরফুদ্দিনকে আরও ৭০ হাজার ডলার দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তিনি আর কোনও অর্থ পাননি।

২০০২ সালের কোনও একসময় কাশেম শরিফের সঙ্গে সেলিম ভূঁইয়ার পরিচয় করিয়ে দেন গিয়াসউদ্দিন আলম মামুন। নাইকো যদি শেষ পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলনের অনুমোদন পায় তাহলে সেলিম ভূঁইয়াকে গ্যাসের পাইপলাইন ও গ্যাস স্টেশন বসানোর মতো কিছু কাজের সাব কন্ট্রাক্ট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন কাশেম শরিফ। সব কাজ ঠিকঠাক সম্পন্ন হয় গেলে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে ছয় কোটি টাকা ( ২০০৩ সালের বিনিময় হারের হিসেবে ১০ লাখ ২৮ হাজার) এবং তিন ধাপে আরও দুই লাখ ৪০ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি দেন কাশেম শরিফ। বাপেক্সের সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি হয়ে যাওয়ার পরই প্রথম কিস্তির তিন কোটি টাকা দিয়ে দেওয়ার কথা নির্ধারণ করা হয়। নাইকো ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিক্রির অনুমোদন পেয়ে গেলে ২৪ মাস ধরে প্রতি মাসে ১০ হাজার ডলার করে মোট দুই লাখ ৪০ হাজার ডলার করে মামুনকে দেওয়ার কথা নির্ধারিত হয়। এসব ছাড়াও, ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিক্রির অনুমতি পাইয়ে দিতে পারলে আরও তিন কোটি টাকা (পাঁচ লাখ ১৪ হাজার ডলার) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে মোশাররফ হোসেন পদত্যাগ করলে ফেনী ও ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিক্রির অনুমোদন জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। ফলে নাইকোও প্রতিশ্রুত ছয় কোটির টাকার মধ্যে বাকি তিন কোটি টাকা এবং দুই লাখ ৪০ হাজার ডলার আটকে দেয়।

২০০৩ সালে বাপেক্সের সঙ্গে নাইকোর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নাইকো কাজ পেয়ে গেল মামুনকে সেলিম ভূঁইয়া জানান, তিনি মামুনের কাছে যে অর্থ পান তা পরিশোধিত হয়েছে বলে ধরে নেবেন। মামুনও স্মরণ করেন, তিনি ৬০-৮০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। যদিও সেলিম ভূঁইয়া ধার নেওয়া অর্থের পরিমাণ এক কোটি হিসেবে উল্লেখ করেন। মামুন ওই অংকের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি।

নাইকো কাজ পেয়ে গেলে সেলিম ভূঁইয়া পরামর্শকদের পাওনা অর্থ দিয়ে দিতে কাশেম শরিফকে দুই-তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দেন, যেখানে অর্থ পাঠানো হয়। অর্থ মামুনের জন্য পাঠানো হলেও তার তদারকি করেছেন সেলিম ভূঁইয়া। মামুনের সঙ্গে জামাল সামসি ও ফজলে আকবর সিদ্দিক সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এই দুজনের নামে একটি কাগজে হাতে লিখে দেওয়া হয়েছিল কাসেম শরিফের কাছে। কাশেম শরিফ বলেছেন, ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য লবিয়িস্টকে (মামুন) অর্থ পরিশোধে তিনি কোনও দোষ দেখেননি।

নাইকো সেলিম ভূঁইয়ার স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে কয়েকবারে মোট তিন কোটি টাকা জমা দেন। সেই অর্থ থেকে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে সেলিম ভূঁইয়া এক কোটি ৮ লাখ টাকা দেন। ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয় পে-অর্ডারের মাধ্যমে। আর বাকি এক কোটি টাকা কয়েকবারে নগদ ও চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়।

সেলিম ভূঁইয়া জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে কয়েকবারে মোট ৬০ লাখ টাকা দিয়েছেন। নিজের জন্য ৬০ লাখ টাকা রেখেছিলেন সেলিম ভূঁইয়া। নিজে কেন নাইকোর দেওয়া অর্থে বেশিরভাগটা রেখেছেন তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন যা বলেছিলেন জবানবন্দিতে তারও উল্লেখ করেছেন সেলিম ভূঁইয়া। তার ভাষ্য, সঙ্গে তারেক রহমানের থাকার কারণ দেখিয়ে নাইকোর কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বেশির ভাগটাই মামুন নিজের কাছে রাখেন।

তবে কানাডার মন্ট্রিলে সেলিম ভূঁইয়া তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছেন, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে দেওয়া অর্থ ‘ধার হিসেবে দেওয়া, যার সঙ্গে গ্যাস চুক্তির কোনও সম্পর্ক নেই।’ মামুনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যে অর্থ তিনি জমা দিয়েছেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রে করা বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা, যার সঙ্গে নাইকোর কোনও সম্পর্ক নেই।

নাইকো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্ট্রাটামের সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০০৩ সালের ২১ অক্টোবর জমা পড়ে ২৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার। স্ট্রাটামের অ্যাকাউন্ট থেকে ২০০৩ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশে অবস্থিত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে থাকা কাশেম শরিফের অ্যাকাউন্টে যায় ৭৩ হাজার ডলার। আর জাপানের ইউএনআইকিউএ করপোরেশনে যায় মোট চার লাখ ১৫ হাজার ডলার। ‘এমএস সুলতানার’ নামে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে থাকা অ্যাকাউন্ট থেকে ২০০৩ সালের ২৯ নভেম্বর সেলিম ভূঁইয়াকে এক কোটি সাত লাখ ৫৪ হাজার ৩০০ টাকা পরিশোধ করা হয়।

২০০৪ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি তার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে পেমেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে এক কোটি ৮ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন এবং ঠিক তার পরেরদিন ওই একই নম্বরের পেমেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এককোটি ৮ লাখ টাকা জমা হয়েছে। কানাডার তদন্তকারী তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, ২০০৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট থেকে জানা যায়, মামুনের যে অ্যাকাউন্টে এককোটি ৮ লাখ টাকা জমা হয়েছিল সেই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে থাকা ক্রেডিট কার্ডটি গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ও তারেক রহমানের।

তারেক রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুন

স্ট্রাটামের অ্যাকাউন্ট থেকে ২০০৩ সালের ২১ অক্টোবর ২৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার পাঠানো হয় ফার্স্ট ক্যারিবিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকে। ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর ফজলে আকবর সিদ্দিকীর অ্যাকাউন্টে যায় প্রায় ২০ হাজার ডলার।

২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর ফজলে আকবর সিদ্দিকীর নামে ইউবিএস এজিতে থাকা ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ে প্রায় ২০ হাজার ডলার। ২০০৩ সালের ১১ নভেম্বর এইচএসবিসি ব্যাংকে থাকা জব্বার আব্দুল মজিদ নামের এক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যায় প্রায় ৫৭ হাজার ডলার। কিন্তু তা ফেরত আসে ২০০৩ সালের ১৭ নভেম্বর। ওই দিনই ওই অর্থ ডিবিটিসিও আমেরিকাসের নিউ ইয়র্ক শাখায় থাকা একটি অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, ওই অর্থ কাশেম শরিফ জামাল শামসির জন্য পাঠিয়েছিলেন। জামাল শামশি ঢাকার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিক। পরে শামসির একই অ্যাকাউন্টে আরও এক লাখ ৩৩ হাজার ৭২৩ মার্কিন ডলার পাঠানো হয়। কাশেম শরিফের ভাষ্য, ডিবিটিসিও আমেরিকাস ও সিদ্দিকীর উদ্দেশে পাঠানো অর্থের আসল প্রাপক সেলিম ভূঁইয়া ও মামুন।

কিন্তু এফবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শামসির কাছে পাঠানো অর্থের প্রকৃত প্রাপক ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ভাই সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম। তিনি বিএনপির ওই আমলে দুইটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তার হাত হয়ে ওই অর্থ যাওয়ার কথা আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে।

এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কাশেম শরিফের কাছ থেকে বাবুল গাজি নামের এক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে অর্থ গেছে, যা আসলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে প্রভাবিত করতে মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকীর জন্য পাঠানো হয়েছিল। কাশেম শরিফ এ তথ্যের সত্যতা অস্বীকার করেছেন।

মামুন কানাডীয় তদন্তকারীকে বলেছেন, যদি নাইকো তার সরাসরি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে কাজ পেত তাহলে তার জন্য নির্ধারিত অর্থের (একলাখ ডলার) এক-চতুর্থাংশ থেকে শুরু করে অর্ধেক পর্যন্ত জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে দিতে হতো। তারেক রহমানের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়ে মামুনের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন কানাডীয় তদন্তকারী, ‘আমার হাতে ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল। কারণ আমি তারেক রহমানের বন্ধু।’ তবে মামুনের দাবি, নাইকোর বিষয়ে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে কোনও আলোচনা করেননি। নাইকো যে গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছে সে বিষয়ে তিনি তারেক রহমান বা খালেদা জিয়াকে প্রভাবিত করেননি। বরং সেলিম ভূঁইয়া ও মোশাররফ হোসেনের কারণেই নাইকো অনুমোদন পেয়েছে। এ বিষয়ে মামুন বলেন, ‘আমি যদি এই কাজটি সম্পন্ন করতাম, তাহলে নিশ্চয়ই আমি মোশাররফকে কিছু দিতাম। তিনি রাজনীতিবিদ। সেহেতু নগদ অর্থে হোক, অন্য কোনও কিছু দিয়ে হোক বা নির্বাচনের সময় সহায়তা করে হোক তাকে কিছু না কিছু আমি তাকে দিতাম।’

সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ

এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নাইকো বাংলাদেশ ২০০২ সালের ১৫ জানুয়ারি মওদুদ আহমদের অ্যাকাউন্টে ৮ হাজার ৩১৫ ডলার পাঠিয়েছে। তাছাড়া, ওই সময়ের মধ্যে মওদুদের স্ত্রী হাসনা যুক্তরাষ্ট্রে ৪ লাখ ডলার মূল্যের একটি বাড়ি কিনেছেন।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেনকে ১ লাখ ৯০ হাজার কানাডিয়ান ডলার মূল্যের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি উপহার দেওয়া হয়। ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই মোশাররফ কালগেরিতে যান একটি তেল গ্যাস প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার জন্য। সঙ্গে ছিলেন সেলিম ভূঁইয়া। ওই ভ্রমণের ব্যয় ছিল প্রায় ৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার। কানাডার তৎকালীন হাইকমিশনার ডেভিড স্প্রাউল জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে টয়োটা গাড়ি দেওয়ার বিষয়ে কাশেম শরিফকে প্রশ্ন করেছিলেন। কাশেম বিষয়টিকে পাত্তাই দেননি। বলেছিলেন, ‘এমন কাজ সব সময় হয়ে আসছে’ এবং ‘এমন পরিস্থিতিতে তারা এসব জিনিস দিয়ে থাকেন।’ স্প্রাউল উল্লেখ করেন, কাশেম শরিফ ব্যক্তিগতভাবে নাইকোর প্রধান নির্বাহী স্যাম্পসনকে জানিয়েছিলেন মন্ত্রীকে ল্যান্ড ক্রুজার দেওয়ার বিষয়ে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের অর্থ ও উপহার দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে নাইকো অবগত ছিল।

এফবিআইয়ের তদন্তকারী তার প্রতিবেদনের এক পার্যায়ে এসে লিখেছেন, ‘অর্থ পাচার ও দুর্নীতি বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ঘুষ দেওয়া থেকে নাইকোকে আড়াল করতেই স্ট্র্যাটামের মাধ্যমে অর্থ দেওয়া হয়। নাইকো রিসোর্সেস বাংলাদেশ, কাশেম শরিফ ও স্ট্র্যাটামের ব্যাংক হিসেব খোলা হয়েছে একটি ক্যারিবিয়ান ব্যাংকে ও একটি সুইস ব্যাংকে। এই লেনদেন কানাডা বা বাংলাদেশে হয়নি, হয়েছে সুইজারল্যান্ড ও কেম্যান আইল্যান্ডের ব্যাংক হিসেবের মাধ্যমে। ওই দুই দেশ ওই সময় অর্থ পাচারের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এটাকে অর্থ লেনদেনের তথ্য গোপন করা এবং অর্থ পরিশোধের উৎস ও প্রকৃতি আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন



ফিচার

অপরাধ বার্তা