[…]বিলুপ্তির পথে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

বিলুপ্তির পথে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:মার্চ ১৪, ২০১৯ , ১১:২১ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: সংবাদ

মেরুদণ্ডহীন নেতৃত্বের কারণে বিএনপির মতো ছাত্রদলের ভরাডুবি

বিএনপির মত আওয়ামী লীগও এক সময় বিরোধী দলে ছিল। কিন্তু বিরোধী দলে থাকলেও ছাত্রলীগ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। তারাই ছিল ক্যাম্পাসের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে পাকিস্তান আমলের এনএসএফের পরিণতি ভোগ করতে হবে এটি কেউ ভাবে নি। যে সকল ছাত্র সংগঠন কখনো খালেদার গ্রেপ্তার নিয়েও কথা বলেনি তাদের পেছনে লেজুরবৃত্তি করার মত নৈতিক পরাজয় একটি দলের জন্য আর কিছু হতে পারে না।

নেতৃত্বে অছাত্র, প্যানেল গঠনে জটিলতা, বাম ও শিবির নির্ভরতা ইত্যাদি কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল প্রার্থীদের ভরাডুবিতে বিস্মিত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। একটি পদেও জয়ী হতে পারবে না- এটা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। এ নিয়ে অসন্তোষ বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও।

ডাকসুতে ভিপি পদে ছাত্র ইউনিয়নের লিটন নন্দি পায় প্রায় ১১শ ভোট। তাদের মূল সমর্থক আরও কম। অর্থাৎ তাদের নেতাকর্মিদের সকলেই তাকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু ছাত্রদলের পক্ষে মাত্র ২৪৫ ভোট পড়েছে। তাহলে সংগঠনের নেতাকর্মীরা কি ভোট দেননি? নিঃসন্দেহে ছাত্রদলের ভোট চলে গেছে কোটা আন্দোলনের বাক্সে। এই ব্যর্থতার দায় ছাত্রদল কখনোই এড়াতে পারবে না।

রাজনীতির কৌশল হিসেবে সাংগঠনিত শক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্প্রতি বাম সংগঠনগুলো জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র সমাজকে ক্যাম্পাস থেকে ধাওয়া দিয়ে বের করে দিয়েছে। এখানে মূল বিষয়টি ছিল শক্তি প্রদর্শন করে ছাত্রদের আকৃষ্ট করা ও মনোবল তৈরি করা। যেহেতু ছাত্রলীগের সঙ্গে শক্তিতে পারবে না তাই জাতীয় ছাত্র সমাজকে লক্ষে পরিনত করা হয়। এটুকু রাজনৈতিক কৌশল না জানলেই নয়।

গত দশ বছরে ছাত্রদল যদি একই কৌশলে বাম সংগঠনগুলোর ওপর শক্তি প্রদর্শন করতো, তাহলে আজ ডাকসুতে তাদেরকে কেউ উপেক্ষা করতে পারতো না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব পলায়নে পারদর্শি শিবির ঘরানার, তাই ছাত্রদল তাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নেতৃত্বের হাল ধরতে পারতো।

ছাত্রলীগের সঙ্গে পেশি শক্তিতে মোকাবেলা করা সম্ভব নয় বলে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনগুলোর উপর হামলা করে ছাত্রদল তাদের অবস্থান জানান না দিলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন শূন্যের কোটায় দাঁড়াবে।

মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ছাত্রদল সক্রিয় ছিল না। আবার কোটা সংস্কার আন্দোলন সহ বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তৈরি না করে, কর্মি সমর্থকদের অন্য সংগঠনের পক্ষাবলম্বন করা থেকে বিরত না রাখার ফলে ছাত্রদলের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন।
ছাত্রদল পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করে অগ্রসর হলে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হতো। কিন্তু বর্তমানে ক্ষুদ্র একটি বাম সংগঠনও ছাত্রদলকে তোয়াক্কা করে না। অন্যদিকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির প্রায় সবাই অছাত্র। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, প্যানেল গঠনে জটিলতা ও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ভোটে অংশ নেয়ার ফলে ডাকসু নির্বাচনে অকল্পনীয় বিপর্যয় হয়েছে।

১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জেরে ডাকসুতে বড় বিজয় পেয়েছিল। কিন্তু সোমবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ছাত্রদল ডাকসুর ২৫টি পদের একটিতেও জয় পায়নি। এমনকি প্রার্থীদের মধ্যে সম্পাদকীয় একটি পদ ছাড়া কেউ হাজারের ওপরে ভোট পাননি।

১২টি সম্পাদকীয় পদের মাত্র একটিতে ছাত্রদলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পেরেছেন। কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম ৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

ভিপি পদে এই সংগঠনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ২৪৫ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন। জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার ৪৬২ ভোট পেয়ে ষষ্ঠ হয়েছেন। আর এজিএস প্রার্থী খোরশেদ আলম সোহেল পেয়েছেন মাত্র ২৯৪ ভোট।

এ ছাড়া ১৮টি হল সংসদের কোনো পদেও ছাত্রদল জয় পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না। হল সংসদগুলোতে ২৩৪টি পদের বিপরীতে ছাত্রদলের প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৫৪ জন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, তফসিল ঘোষণার পর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ছাত্রদলে দ্বিধাবিভক্তি ছিল।
কেন্দ্রীয় একজন যুগ্ম সম্পাদক বলেন, ছাত্রদল প্রার্থীদের জয়ী করার ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের আন্তরিকতার অভাবও ছিল। কারণ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ হাজারের মতো অনাবাসিক ছাত্র ছিল। তাদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাদের বাসায় গিয়ে অথবা ফোন করে যোগাযোগ করা যেত। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ আগ্রহই দেখাননি।

অধিকাংশ নেতাকর্মিদের মতে, ছাত্রদলকে এগিয়ে যেতে হলে শক্তি প্রদর্শনের বিকল্প নেই।
কোটা ও বাম সংগঠনগুলো খালেদার কারাবরণ নিয়ে নীরব, এমনকি হাসি-তামাশাও করেছে। তাদের পেছনেই যখন ছাত্রদল থাকে তখন রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য। কোটা নেতাদের শিবির সংশ্লিষ্টতার কারণে কখনো মৌখিক বিরোধিতা, আবার কখনো তাদের পেছনে থাকার ফলে সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হয়েছে। ছাত্রদলকে অনলাইনে ও অফলাইনে অন্যান্য সংগঠনের সহচার্য থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক কৌশল হিসেবে বাম সংগঠন বা কোটা নেতাদের উপর হামলা করে ক্যাম্পাস ছাড়া করলে ছাত্রদের মাঝে ছাত্রদলের প্রতি আস্থা সৃষ্টি হতে পারে যা ক্রমে জাগরণ সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।

কোটা ও বাম সংগঠনগুলো খালেদার কারাবরণ নিয়ে নীরব, এমনকি হাসি-তামাশাও করে। তাদের পেছনেই যখন ছাত্রদল থাকে তখন রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য।



ফিচার

কর্মসংস্থান

অপরাধ বার্তা